শরতের শেষ আলো পেরিয়ে হেমন্তের দুয়ারে প্রকৃতি। ভোরের আলো ফুটতেই মেঘের আড়াল সরিয়ে উত্তর আকাশে দেখা দিল হিমালয়ের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত এই দৃশ্যের দেখা পেয়ে আনন্দে মেতেছেন পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় আসা পর্যটকেরা।
দেশের সর্বোত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া ডাকবাংলোর উঁচু প্রান্তে দাঁড়ালে চোখ আটকে যাচ্ছে উত্তরের আকাশে। বরফে ঢাকা পর্বতশৃঙ্গ কখনো রুপালি, কখনো সোনালি, আবার ভোরের প্রথম আলোয় ক্ষণিকের জন্য লালচে আভায় ধরা দিচ্ছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এমন দৃশ্য পর্যটকদের কাছে যেন এক অন্য রকম প্রাপ্তি।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে সূর্য ওঠার কিছু পর তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো এলাকা থেকে স্পষ্ট দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘা। পঞ্চগড়ের বিভিন্ন উঁচু স্থান থেকেও পর্বতটির সৌন্দর্য উপভোগ করেন অনেকে। খবর ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও শেয়ার করতে শুরু করেন পর্যটকেরা।
জানা গেছে, চলতি মৌসুমে এর আগে ১২, ১৩ ও ১৪ অক্টোবর কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মিলেছিল। এরপর মেঘ, কুয়াশা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে দীর্ঘ সময় আড়ালে ছিল পর্বতশৃঙ্গটি। দুর্গাপূজার ছুটিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক পর্যটক তেঁতুলিয়ায় এলেও অনেকে কাঙ্ক্ষিত দৃশ্য না দেখেই ফিরে গিয়েছিলেন। এবার সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে।

ভোরের প্রথম আলো বরফঢাকা চূড়ায় পড়তেই মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যেতে থাকে কাঞ্চনজঙ্ঘার রং। প্রথমে লালচে আভা, এরপর ধীরে ধীরে রুপালি ও শুভ্র সাদা। সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় পর্বতটির রূপও। বেলা বাড়লে দূরত্বের নীলচে আবছায়ায় ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় শৃঙ্গটি।
স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সাধারণত অক্টোবর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আকাশ পরিষ্কার থাকলে তেঁতুলিয়া থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সুযোগ তৈরি হয়। তবে এটি পুরোপুরি নির্ভর করে আবহাওয়া, মেঘ, কুয়াশা ও দৃশ্যমানতার ওপর।
তেঁতুলিয়ার ডাকবাংলো থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার পাশাপাশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে উত্তরের সীমান্তঘেঁষা প্রকৃতিও। মহানন্দা নদীর তীর, চা-বাগান, সীমান্তের ওপারের দৃশ্য আর ভোরের কুয়াশা—সব মিলিয়ে তেঁতুলিয়ার শীতের সকাল হয়ে ওঠে একেকটি ছবির ফ্রেম।
দিনের আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘা মিলিয়ে গেলেও তেঁতুলিয়ার সৌন্দর্য থেমে থাকে না। বিকেলে মহানন্দার তীরে সূর্যাস্ত আর রাতের অন্ধকারে সীমান্তের ওপারের আলো প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য তৈরি করে ভিন্ন এক আবহ।

দীর্ঘদিন ধরে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার অপেক্ষায় থাকা পর্যটকদের মধ্যেও দেখা গেছে স্বস্তি ও আনন্দ। বরিশাল থেকে আসা আলিয়া মান্নানের কাছে বাংলাদেশে বসে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা ছিল বিশেষ এক অভিজ্ঞতা। সাভার থেকে আসা ফরিদুল ইসলামও সকালে তেঁতুলিয়ায় পৌঁছে কাঙ্ক্ষিত দৃশ্য দেখে উচ্ছ্বসিত হন। আর রংপুরের অর্ণব পাঁচ বছর ধরে চেষ্টা করেও যে দৃশ্য দেখতে পারেননি, এবার সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে।
তেঁতুলিয়া প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষক সামিউজ্জামান জানান, তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা কমতে শুরু করেছে। মঙ্গলবার সকালে সেখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৬ দশমিক ০১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগামী কয়েক দিন আকাশ পরিষ্কার থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সুযোগ থাকতে পারে।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় তেঁতুলিয়া ট্যুরিস্ট পুলিশও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দর্শনার্থীদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে বিশেষ টহল ও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্যুরিস্ট পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) লোকেশ চন্দ্র দাশ।
তেঁতুলিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আনোয়ার হোসাইন বলেন, মঙ্গলবার বেশ সুন্দর ও স্পষ্টভাবে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা গেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে নভেম্বরজুড়েও পর্যটকেরা এই দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রতিনিধি/এসএস




