পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে তিন বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন সুয়েতি আক্তার (২৪) নামে এক বাংলাদেশি নারী। কোনো কোনো গণমাধ্যম তার নাম সিঁথি, আবার কোথাও সুইটি বলে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু এই নারী আসলে কে?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তার নাম সুয়েতি। সৌদির মাটিতে পা রাখার পর কয়েক মাস নিয়মিত টাকা পাঠাতেন বাড়িতে। সেই টাকায় মোটামুটি ভালোই চলছিল পরিবারটি। কিন্তু সৌদিতে যাওয়ার ছয় মাস পর তিনি গ্রেফতার হন। বিষয়টি জানতেন না পরিবারের সদস্যরা।
দীর্ঘ এক বছর পর সুয়েতির রুমমেট ও স্থানীয় দালালের মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে, তাদের মেয়ে সৌদির কারাগারে রয়েছে। পরে মোবাইল ফোনে সুয়েতি নিজেই পরিবারকে তার কারাবরণের কথা জানিয়েছিলেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় মাসে দু-একবার পরিবারের সঙ্গে কথাও হতো সুয়েতির।
তবে কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির শিরচ্ছেদের খবর, ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, সুয়েতি বগুড়া বা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাসিন্দা।
ফেসবুকে আরও প্রচার হচ্ছে, মসজিদে অসামাজিক কার্যক্রমের অপরাধে সৌদির আদালত শিরচ্ছেদ করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে তাকে। আবার গুঞ্জন উঠেছে, ওমরাহ করতে গিয়ে এক যুবকের সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধরা পড়ায় সৌদি সরকার তাদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। ফলে ওই নারীর পরিচয় নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে।
তবে পরিবার বলছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ওই নারীর নাম সুয়েতি। তার বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে। তিনি উপজেলার মহেড়া ইউনিয়নের নগর ছাওয়ালী চরপাড়া গ্রামের ফজলু মিয়ার মেয়ে। পাঁচ বোনের মধ্যে সবার ছোট সুয়েতি। দাম্পত্য জীবনে প্রথম বিচ্ছেদের পর পারিবারিকভাবে একই গ্রামের শিপন মিয়া নামে এক যুবকের সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়ে করে সংসার শুরু করেন। পরে সেটিও টেকেনি।
পরিবারের দাবি, ২০২৩ সালে স্থানীয় লতু মিয়া নামে এক দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে যান সুয়েতি। পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে চাকরির কথা বলে তাকে সৌদি পাঠানো হয়। এ জন্য লতু মিয়াকে কয়েক দফায় প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল।
সৌদি আরবে যাওয়ার পর মক্কায় আল-মাজাল আল আরাবি গ্রুপ কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন সুয়েতি। সম্প্রতি ফেসবুকের মাধ্যমে মেয়ের মৃত্যুদণ্ডের খবর জেনেছে তার পরিবার। এ নিয়ে পরিবারে নেমে এসেছে চরম উৎকণ্ঠা। ছড়িয়ে পড়া ছবির এক নারীকে নিজেদের মেয়ে সুয়েতি আক্তার বলে দাবি তাদের।
সুয়েতির বাবা দিনমজুর ফজলু মিয়া বলেন, গত ১৩ অক্টোবর সকালে মেয়ের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়েছে। তখন সে বলেছিল, আড়াই মাসের মধ্যে দেশে ফিরবে। এরপর আর কোনো যোগাযোগ নেই। তখন সুয়েতি জানিয়েছিল, মারামারির একটি মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তবে সৌদিতে থাকা সুয়েতির এক বান্ধবী পরিবারকে জানান, বাংলাদেশি এক যুবকের সঙ্গে সম্পর্কের জেরে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এরপর থেকেই মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছিল তাদের। এর মধ্যে ফেসবুকে দুই বাংলাদেশির শিরচ্ছেদের খবর, ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়লে সেই উৎকণ্ঠা রীতিমতো আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুয়েতির মা জহুরা বেগম বলেন, সুয়েতি বাড়িতে আসবে বলছিল। পরে আর কথা হয়নি। সুয়েতি যদি কোনো অন্যায় বা কারও সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশ সরকারকে কেন জানানো হলো না।
তিনি বলেন, সৌদি সরকার আমার মেয়েটিকে হত্যা করেছে। আমার মেয়েটাকে জীবিত হোক বা মৃত হোক ফিরিয়ে দিন। যদি কোনো অঘটন ঘটে থাকে, তাহলে অন্তত সত্যিটা আমাদের জানান। মেয়ের কী হয়েছে— এই চিন্তায় আমরা ঘুমাতে পারছি না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটাই দাবি, আমার মেয়েটাকে আমার কোলে এনে দিন। আর কিছু চাই না।
পরিবারের অন্য সদস্যদের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবির সত্যতা যাচাই করে দ্রুত সুয়েতি আক্তারের বর্তমান অবস্থা নিশ্চিত করা হোক। তিনি জীবিত থাকলে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ এবং তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা সাজা হয়ে থাকলে সে সম্পর্কেও পরিবারকে সরকারি তথ্য জানানো হোক।
তারা আরও জানান, সুয়েতি পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজে গিয়েছিলেন, ওমরাহ বা হজ করতে যাননি। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। তার সঙ্গে কারও সম্পর্ক ছিল কি না, সে সম্পর্কেও তারা অবগত নন।
এ ঘটনায় মির্জাপুর থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সুয়েতি আক্তারের বিষয়ে আমরা অবগত না। সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। ওই ঘটনায় সে জড়িত কি না, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বিস্তারিত জানতে তার বাড়িতে পুলিশ পাঠানো হয়েছে এবং তথ্য সংগ্রহ ও অনুসন্ধান চলছে।
মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জহিরুল আলম বলেন, এ বিষয়ে অফিসিয়ালি এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন মাধ্যমে খবর পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য খোঁজ নেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, সৌদির মক্কায় একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অপরাধে বাংলাদেশের দুই নাগরিককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে দেশটির সরকার। গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) ওই দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর জানায়।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে সুয়েতির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। তারা জানতে পেরেছেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ সুয়েতিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে এবং সম্প্রতি তা কার্যকরও করেছে।
তবে সুয়েতি আক্তার ওই ঘটনায় জড়িত কি না, কিংবা তিনি বর্তমানে জীবিত আছেন নাকি মৃত- সে বিষয়ে এখনো কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে সাংবাদিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের মে মাসে ওই নারীর পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছে। সৌদি আরব যেতে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হয় তাকে।
সরকারি লোগো সংবলিত এই কার্ডটিতে বলা হয়েছে, কার্ডধারী নারী ইন্সুরেন্স কাভারেজ এবং ওয়েলফেয়ার সার্ভিস পাবেন।
এএইচ



