বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

উল্টো অবস্থানে নবজাতক, সিজারিয়ানে বিলম্বের অভিযোগে শেষ পর্যন্ত মৃত্যু

জেলা প্রতিনিধি, শরীয়তপুর
প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৯ পিএম

শেয়ার করুন:

উল্টো অবস্থানে নবজাতক, সিজারিয়ানে বিলম্বের অভিযোগে শেষ পর্যন্ত মৃত্যু
ছবি: সংগৃহীত

গর্ভের সন্তানটি ছিল উল্টো অবস্থানে। প্রসবের জটিলতার বিষয়টি ক্লিনিকে নেওয়ার সময়ই জানানো হয়েছিল বলে দাবি পরিবারের। স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসকের অপেক্ষায় কেটে যায় কয়েক ঘণ্টা। এর মধ্যে প্রসূতির শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। একপর্যায়ে গর্ভ থেকে শিশুর একটি পা বের হয়ে আসে। পরে স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা করতে গিয়ে দুই নার্সের টানাটানির অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, শিশুটির হাত-পা বের হলেও আটকে যায় মাথা। শেষ পর্যন্ত নবজাতকটির মৃত্যু হয়।

শরীয়তপুরের হাজী শরীয়তউল্লাহ জেনারেল হাসপাতালে ঘটে যাওয়া এ ঘটনা ঘিরে চিকিৎসাসেবার মান, জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের উপস্থিতি এবং সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করতে বিলম্বের অভিযোগ সামনে এসেছে। নবজাতককে হারিয়ে শোকাহত পরিবারটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) প্রসববেদনা নিয়ে ওই ক্লিনিকে ভর্তি হন ১৯ বছর বয়সী স্বপ্না বেগম। তবে নবজাতকের মৃত্যু কীভাবে হলো এবং চিকিৎসায় কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা নিয়ে পরিবার ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।

স্বপ্না বেগমের স্বামী সজল হাওলাদার ঢাকার শহীদনগর এলাকায় বসবাস করেন। গর্ভাবস্থায় দেখাশোনার সুবিধার্থে প্রায় তিন মাস আগে স্বপ্নাকে শরীয়তপুরে তার মায়ের কাছে পাঠানো হয়। বুধবার সন্ধ্যায় প্রসববেদনা শুরু হলে তার মা সালমা আক্তার (৩৮) তাকে হাজী শরীয়তউল্লাহ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান।

পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালে নেওয়ার সময়ই জানানো হয়েছিল, গর্ভের শিশুটি উল্টো অবস্থানে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে নিরাপদে প্রসব করানো হবে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন স্বজনরা। তাদের দাবি, চিকিৎসক এসে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করবেন—এমন আশ্বাস দেওয়া হলেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।

স্বপ্নার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে স্যালাইন দেওয়া হয় বলে জানান স্বজনরা। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসক না আসায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ১১টার দিকে শিশুটির একটি পা বের হয়ে আসে। এ অবস্থায় ক্লিনিকের দুই নার্স পিয়ালি রানী ও আফরোজা স্বপ্নার মাকে অন্য ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে মেয়ের শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় তখন তাকে অন্যত্র নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে জানান সালমা আক্তার।

স্বজনদের অভিযোগ, একপর্যায়ে দুই নার্স স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে শিশুটিকে বের করার চেষ্টা করেন। এ সময় শিশুটির পা ও হাত বের হলেও মাথা আটকে যায়। শিশুটিকে বের করতে টানাটানি করা হয় বলেও দাবি পরিবারের। পরে নবজাতকটির মৃত্যু হয়। এরপর পাশের একটি ক্লিনিক থেকে গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পারসা সানজানাকে ডেকে আনা হয়। শিশুটির অবস্থা দেখে তিনি দায়িত্ব নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং নবজাতকটি মারা গেছে বলে জানান বলে দাবি করেন স্বজনরা।

পরিবারের অভিযোগ, রাত ১টার দিকে দুই নার্স জরায়ুর পাশে কেটে শিশুটিকে বের করেন। এর পর স্বপ্নার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে রাত আড়াইটার দিকে তাকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।

সালমা আক্তার বলেন, মেয়েকে হাসপাতালে নেওয়ার পরই জানিয়েছিলাম, গর্ভের শিশু উল্টো অবস্থানে রয়েছে। তারা বারবার বলেছে, ডাক্তার এলেই সিজার করা হবে। কিন্তু চার ঘণ্টা পার হলেও ডাক্তার আসেননি। পরে শিশুর পা বের হয়ে গেলে দুই নার্স টানাটানি করেন। একপর্যায়ে শিশুর মাথা আটকে যায়।

তিনি আরও বলেন, আমার সন্তান ও নাতির সঙ্গে যা হয়েছে, তা অবহেলার কারণে হয়েছে বলে আমরা মনে করি। আমরা এর বিচার চাই।

অভিযোগের বিষয়ে ক্লিনিকের মালিক নয়ন সরকার বলেন, রাতে তাদের নিয়মিত চিকিৎসক উপস্থিত থাকেন না। এ ক্ষেত্রে অন্য চিকিৎসক এনে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।

নয়ন সরকারের ভাষ্য, অন্য চিকিৎসক আসার সময় শিশুটির পা বের হয়ে গিয়েছিল। পরে ওই চিকিৎসক ঝুঁকি নিতে চাননি বলে চলে যান। এরপর নার্সরা প্রসব করানোর চেষ্টা করেন। শিশুটি মায়ের পেটেই মারা যায় বলে দাবি করেন তিনি।

নার্স, চিকিৎসক, অপারেশন থিয়েটারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও আবাসিক মেডিকেল অফিসার ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে নয়ন সরকার বলেন, রোগীর স্বজনেরা যা বলবেন, সবাই সেটিই বিশ্বাস করবেন; তাদের বক্তব্য কেউ বিশ্বাস করবেন না।

ওই সময় নারী আবাসিক মেডিকেল অফিসার না থাকলেও একজন পুরুষ আবাসিক মেডিকেল অফিসার উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে তাদের পক্ষ থেকে কোনো অবহেলা হয়নি বলেও জানান ক্লিনিক মালিক।

ক্লিনিকের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) চিকিৎসক মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি পরিবারেরও অবহেলা থাকতে পারে। তার দাবি, শিশুটি উল্টো অবস্থানে ছিল এবং তার হৃদস্পন্দন কম ছিল। এ তথ্য জানার পরও পরিবারের পক্ষ থেকে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করানো হয়নি। তবে প্রসূতির সংকটাপন্ন অবস্থার কথা তাকে সময়মতো জানানো হয়নি বলে স্বীকার করেন শরিফুল ইসলাম।

তিনি বলেন, শিশুটির মায়ের অবস্থা সংকটাপন্ন ছিল। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা নার্সরা আমাকে বিষয়টি জানাননি। জানালে হয়তো সঠিক পরামর্শ দিতে পারতাম। রাত ১১টার দিকে আমাকে জানানো হয়। সেখানে গিয়ে দেখি, শিশুটির পা বের হয়ে আছে।

শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন বলেন, ক্লিনিকটির অনুমোদন রয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্ত প্রতিবেদন বিভাগীয় দপ্তরে পাঠানো হবে। ক্লিনিকের অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পালং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম বলেন, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে তারা ঘটনাটি জানতে পারেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। পরিবারের অভিযোগ, শিশুটি উল্টো অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও নার্সরা স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা করেন এবং পরে শিশুটির মৃত্যু হয়।

ওসি জানান, পরিবারকে লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এমআর/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর