পিরোজপুরে প্রাণিসম্পদ বিভাগের তীব্র জনবলসংকটে ব্যাহত হচ্ছে সরকারি পশুচিকিৎসা ও দাফতরিক কার্যক্রম। জেলা প্রাণিসম্পদ দফতরসহ সাতটি উপজেলা প্রাণিসম্পদ দফতর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের ৮৭টি মঞ্জুরিকৃত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৫ জন। অর্থাৎ, শূন্য রয়েছে ৬২টি পদ, যা মোট পদের প্রায় ৭১ শতাংশ। সীমিত জনবল দিয়ে সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মরত ব্যক্তিরা। অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক না পেয়ে বাড়তি টাকা খরচ করে বেসরকারি চিকিৎসকের কাছে যেতে হচ্ছে খামারি ও সাধারণ মানুষকে।
জেলা প্রাণিসম্পদ দফতরের তথ্য অনুযায়ী, জেলা কার্যালয়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে সাতটি পদ শূন্য রয়েছে। বর্তমানে মাত্র তিনজন জনবল দিয়ে দাফতরিক কার্যক্রম চলছে।
উপজেলাগুলোর মধ্যে পিরোজপুর সদর দফতরের ১১টি পদের মধ্যে নয়টিই শূন্য। মাত্র দুজন কর্মচারী দিয়ে চলছে কার্যক্রম। জিয়ানগরে আটটি পদ শূন্য থাকায় তিনজনকে দিয়ে চিকিৎসাসেবা চালানো হচ্ছে। নাজিরপুরে ছয়জন কর্মরত থাকলেও শূন্য রয়েছে পাঁচটি পদ। মঠবাড়িয়ায় আটটি পদ শূন্য, সেখানে মাত্র তিনজন দিয়ে হাসপাতাল পরিচালিত হচ্ছে। ভান্ডারিয়ায় ১১টি পদের মধ্যে নয়টি শূন্য; কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। কাউখালী ও নেছারাবাদে আটটি করে পদ শূন্য রয়েছে। দুই উপজেলাতেই মাত্র তিনজন করে দায়িত্ব পালন করছেন।

খামার ও উৎপাদন বাড়লেও সেবায় সংকট
জেলা প্রাণিসম্পদ দফতরের তথ্যানুযায়ী, পিরোজপুরে গাভির খামার রয়েছে ৭৪২টি, গরু মোটাতাজাকরণের খামার ২১৬টি, ছাগলের খামার ৩৩২টি এবং মহিষের খামার ২৭টি। এ ছাড়া লেয়ার মুরগির খামার ৯৯১টি, ব্রয়লার ৩১২টি, সোনালি মুরগির খামার ১৭২টি, হাঁসের খামার ১৩৪টি এবং কবুতরের খামার রয়েছে ৩৬টি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলায় ১ লাখ ৬১ হাজার মেট্রিক টন দুধ, ১ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন মাংস এবং ১৬ লাখ ৮৭ হাজার ডিম উৎপাদিত হয়েছে। বিপুলসংখ্যক খামার ও উৎপাদনের বিপরীতে সরকারি প্রাণিচিকিৎসা সেবায় জনবলসংকট থাকায় ভোগান্তিতে পড়ছেন খামারি ও সেবাপ্রার্থীরা।
পিরোজপুর শহরের মণ্ডলপাড়ার বাসিন্দা মাহবুব হোসেন বলেন, প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে গেলে নিয়মিত চিকিৎসক পাওয়া যায় না। পরে জানতে পারেন, চিকিৎসকের পদ শূন্য। দ্রুত নিয়োগের মাধ্যমে পদগুলো পূরণ করতে কর্তৃপক্ষের প্রতি দাবি জানান তিনি।
জিয়ানগর উপজেলার কলেজশিক্ষার্থী মো. শিহাব হাওলাদার বলেন, অসুস্থ পোষা বিড়াল নিয়ে হাসপাতালে এসে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু একমাত্র চিকিৎসক উপজেলায় একটি কর্মসূচিতে যাওয়ায় তাকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হয়নি। পর্যাপ্ত চিকিৎসক থাকলে এমন ভোগান্তি হতো না বলে মনে করেন তিনি।
ইন্দুরকানী প্রেসক্লাবের সদস্য মো. আল আমিন বলেন, এলাকার মানুষ হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালনে আগ্রহী হচ্ছেন। কিন্তু মাত্র দুই থেকে তিনজন কর্মী দিয়ে একটি উপজেলার কার্যক্রম চালানো কঠিন। দ্রুত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে পূর্ণাঙ্গ জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
পিরোজপুর সদর উপজেলার কদমতলা এলাকার খামারি মো. জুলফিকার খানের ২০ থেকে ২৫টি গরু রয়েছে। তিনি বলেন, গরু অসুস্থ হলে হাসপাতালে চিকিৎসক পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে বেসরকারি চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়। এতে বাড়তি টাকা ও সময় ব্যয় হয়।
সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দফতরের ড্রেসার কার্তিক চন্দ্র হাওলাদার বলেন, ১১ জনের কাজ করছেন মাত্র দুজন। এতে সেবা দিতে প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থা। একটু বৃষ্টি হলেই ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে।
মঠবাড়িয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহা. নূর আলম বলেন, ওষুধের সংকট না থাকলেও অর্ধেকের কম জনবল দিয়ে এত বড় উপজেলায় সেবা দেওয়া কঠিন। জনবলসংকটের কারণে মাঠপর্যায়ে টিকাদান, বিনা মূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প ও উঠান বৈঠকের মতো কার্যক্রমেও গতি আনা যাচ্ছে না।
জিয়ানগর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. মহিউদ্দিন বলেন, রাজস্ব খাতের ১১টি পদের মধ্যে আটটিই শূন্য। একা মাঠপর্যায়ের কাজ ও কার্যালয়ের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে সেবার মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় ওই প্রকল্পের চার-পাঁচজন কর্মীও চলে গেছেন। এতে জনবলসংকট আরও বেড়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তরুণ কুমার সিকদার বলেন, জেলা কার্যালয়সহ সাতটি উপজেলায় তীব্র জনবলসংকট রয়েছে। এতে জেলাজুড়ে সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটছে। তবু বিদ্যমান জনবল দিয়ে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। জেলা কার্যালয়ের সংযোগ সড়কের বেহাল অবস্থা এবং সদর দফতরের জরাজীর্ণ ভবন মেরামতের বিষয়েও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। জনবল নিয়োগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে সেবার মান স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রতিনিধি/এসএস




