ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি জনপদ বগাঝড়া, সোহাগীপাড়া, কংকরপুর, জাঙ্গালিয়াপাড়া, দুধকুড়া, লাঙ্গলজোড়া ও ভালুকাপাড়ায় বসবাস হাজং জনগোষ্ঠীর। উপজেলায় এই জনগোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। যুগ যুগ ধরে এসব গ্রামে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় রীতিনীতি চর্চা করে আসছেন তারা। তবে শিক্ষার সীমিত সুযোগ, আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাব ও যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছে তাদের মাতৃভাষা ও ঐতিহ্য।
উপজেলা সদর থেকে অন্তত ১২ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ঘেঁষা দুধকুড়া ও জাঙ্গালিয়াপাড়া গ্রাম। এসব এলাকার বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। শিক্ষা ও যোগাযোগব্যবস্থার সংকটের পাশাপাশি নিজেদের ভাষা-সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার চ্যালেঞ্জেও পড়েছেন তারা।
সোমবার (১২ অক্টোবর) দুধকুড়া গ্রামে কথা হয় মিতালি হাজংয়ের সঙ্গে। প্রায় ১০ বছর আগে তার স্বামী মারা গেছেন। তিন ছেলেকে নিয়ে তার সংসার। দুই ছেলে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে অর্থনৈতিক সংকটে পড়াশোনা ছেড়ে কাজের সন্ধানে ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছেন। আরেক ছেলে স্কুলে ভর্তি হলেও সচেতনতার অভাবে ঝরে পড়েছে।
জাঙ্গালিয়াপাড়ার বাসিন্দা সুগেন্দ্র হাজং (৫০) কৃষিকাজ করে সংসার চালান। তিনি বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে। আশপাশে কোনো স্কুল নেই। বাচ্চাদের স্কুলে যেতে হলে একদিকে তিন কিলোমিটার দূরের চারুয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, অন্যদিকে অন্তত পাঁচ কিলোমিটার দূরের কলসিন্দুর স্কুলে যেতে হয়। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না থাকায় ছোট বাচ্চারা দূরের স্কুলে যেতে চায় না। ফলে আমাদের ছেলেমেয়েরা ঠিকমতো শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’
একই গ্রামের নারায়ণ হাজং বলেন, শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবে তাদের জনগোষ্ঠী পিছিয়ে রয়েছে। প্রত্যাশা থাকলেও আধুনিক সমাজের মূলধারার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না তাঁরা।
হাজং-অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে যোগাযোগব্যবস্থারও বেহাল দশা। কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে হাটবাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয় বাসিন্দাদের। শুকনো মৌসুমে মোটরসাইকেল ও বাইসাইকেল তাদের যাতায়াতের ভরসা। বর্ষায় বৃষ্টিতে মাটির রাস্তা কাদায় ভরে যায়, তখন পায়ে হেঁটে চলাও কঠিন হয়ে পড়ে। স্কুলশিক্ষার্থী ও রোগীদের নিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না থাকায় উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাত করতেও সমস্যায় পড়েন তারা। এর প্রভাব পড়ছে তাদের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক অবস্থায়।

কমছে মাতৃভাষার চর্চা
হাজংদের রয়েছে নিজস্ব মাতৃভাষা। স্থানীয়দের ভাষ্য, এই ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা নেই; বংশপরম্পরায় মুখে মুখে এর চর্চা চলে আসছে। তবে নিজ সম্প্রদায়ের বাইরে ভাষাটি ব্যবহারের সুযোগ কম থাকায় নতুন প্রজন্মের মধ্যে এর চর্চা কমছে।
মিতালি হাজং বলেন, ‘আমরা শুধু বাড়িতেই হাজং ভাষায় কথা বলি। বাজারে গেলে বাংলা ভাষাতেই কথা বলতে হয়।’
হাজং ভাষা টিকিয়ে রাখতে নিজ উদ্যোগে কাজ করছেন অন্তর হাজং নামের এক যুবক। তিনি হাজং-অধ্যুষিত গ্রামগুলো ঘুরে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের এই ভাষা শেখাচ্ছেন।
ভাষা কল্যাণ পরিষদের সভাপতি মতিলাল হাজং বলেন, নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন আর শুদ্ধভাবে হাজং ভাষায় কথা বলতে পারে না। বাংলা ভাষার প্রভাব এবং নিজেদের ভাষা চর্চার সুযোগের অভাবে ধীরে ধীরে এর ব্যবহার কমে যাচ্ছে। হাজং ভাষা লিপিবদ্ধ করে সংরক্ষণের জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান তিনি।
হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও উৎসব
হাজংদের রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাক পাথিন ও মারকিন। ঐতিহ্যগতভাবে নারীরা পাথিন এবং পুরুষেরা মারকিন পরতেন। এসব পোশাক তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেও এগুলো পরার প্রচলন ছিল। তবে আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাবে ঐতিহ্যবাহী পোশাকের ব্যবহার কমে আসছে।
ভাষার পাশাপাশি হাজংদের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মীয় রীতিনীতি। ‘দেউলি’ নামে তাদের একটি বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান রয়েছে। এতে গানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালন করা হয়। হাজংদের ভাষ্য, একসময় অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান ঘরে তোলার পর গ্রামজুড়ে চরমাগা, লেওয়াটানা ও মহিষাসুর গানসহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। সময়ের সঙ্গে এসব ঐতিহ্যের অনেক কিছুই হারিয়ে যেতে বসেছে।
হাজং ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন প্রবীণ ব্যক্তিত্ব মতিলাল হাজং। তিনি বলেন, ১৯৮০ সালে তার নেতৃত্বে ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে প্রথম দেউলি উৎসবের আয়োজন করা হয়। পরে বাংলা একাডেমি ও ছায়ানটেও এ উৎসব আয়োজন করা হয়। এরপর নিজ এলাকায় ফিরে গ্রামে গ্রামে সাংস্কৃতিক দল গঠন করে দেউলি উৎসবের আয়োজন শুরু করেন তিনি।
তবে হাজংদের আরও অনেক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে, যেগুলোর চর্চা এখন আর তেমন হয় না। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে হারিয়ে যেতে বসা এসব ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব বলে মনে করেন মতিলাল হাজং।

ইতিহাস ও শিকড় ধরে রাখার লড়াই
হাজং জনগোষ্ঠীর বাসিন্দাদের ভাষ্য, তাদের লড়াই শুধু টিকে থাকার নয়, নিজেদের ইতিহাস ও শিকড় ধরে রাখারও। যুগে যুগে নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাদের। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় টংক আন্দোলন। জমিদারদের শোষণ ও টংক প্রথার বিরুদ্ধে কৃষকদের এই আন্দোলনে হাজংদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
টংক আন্দোলনের সময় হাজংদের ওপর ব্যাপক অত্যাচার-নির্যাতন চালানো হয়েছিল বলে জানান মতিলাল হাজং। তার ভাষ্য, ওই সময় অনেক হাজং প্রাণ হারান। অনেকে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হন।
মতিলাল হাজংয়ের দাবি, একসময় বাংলাদেশে এক লাখের বেশি হাজং জনগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস ছিল। বর্তমানে তাদের সংখ্যা কমে প্রায় ১২ হাজারে দাঁড়িয়েছে।
মতিলাল হাজং বলেন, ‘আমরা শুধু বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছি না, আমাদের ইতিহাস ও শিকড় আঁকড়ে ধরে রাখার জন্যও লড়াই করছি।’
প্রতিনিধি/এসএস




