নানা ধরনের অনিয়ম আর দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠান ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে সঠিক সেবা দান থেকে শুরু করে হাসপাতালের প্রতিটি স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে রয়েছে সেবাপ্রত্যাশীদের অসংখ্য অভিযোগ। ফরিদপুরসহ এর আশেপাশের জেলা থেকে আগত রোগীদের বেশিরভাগই কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে অসন্তোষ নিয়ে ফিরে যান বলে জানিয়েছেন তারা।
এছাড়া এই হাসপাতালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্ত দালাল সিন্ডিকেট। এরা হাসপাতালে আগত রোগীদের অনেককেই ফুসলিয়ে বা নানা লোভ দেখিয়ে আশপাশের প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নিয়ে যান, এতে অনেক রোগেই প্রতারণার শিকার হন। হাসপাতালটির বিরুদ্ধে এত এত অভিযোগ থাকলেও কর্তৃপক্ষ কখনো এটাই স্বীকার করেনি ও দায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থাগ্রহণ করতে দেখা যায়নি।
সম্প্রতি হাসপাতালটিতে সেবা নিতে আসা দুই রোগী ফরিদপুর সদর উপজেলার কানাইপুর ইউনিয়নের হোগলা কান্দি গ্রামের রবিন শেখের ৩ বছরের শিশু সাফা মারওয়া ও রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার উজান চার ইউনিয়নে জামতলার হাট জ্যেতিনবর্দিপাড়া গ্রামের রাকিবুল ইসলামের স্ত্রী বীথি আক্তারের করুণ মৃত্যু হাসপাতালের ও ব্যবস্থাপনার চিত্রকেই পরিষ্কার করে ফুটিয়ে তুলেছে।
টাকা না দেওয়ায় মেলেনি ট্রলি, হাতে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে ছোটাছুটির পর শিশুর মৃত্যু!
এই হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়দের মধ্যেও রয়েছে কঠিন সিন্ডিকেট। এরা টাকা ছাড়া নড়তেই চায় না। গত ৫ অক্টোবর টাকা না দেওয়ায় টলি না পেয়ে এক হাতে অক্সিজেনের মাস্ক, অন্য হাতে ঝুলে থাকা স্যালাইনের বোতল কোলে তিন বছরের সংকটাপন্ন শিশু। আর পাশে এক স্বজন বহন করেছেন ভারী অক্সিজেন সিলিন্ডার- এভাবেই রোগীকে নিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দিকে দিশেহারা হয়ে ছুটছেন স্বজনরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন এক ভিডিওকে ঘিরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবার অব্যবস্থাপনা নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
তখন স্বজনরা অভিযোগ করেন, মুমূর্ষু শিশুটিকে দ্রুত জরুরি বিভাগে নেওয়ার জন্য স্ট্রেচার বা ট্রলি (চাকা লাগানো ধাতব বা প্লাস্টিকের শয্যা) চাওয়া হলে কর্মচারীরা টাকার দাবি জানান। দাবি করা টাকা দিতে না পারায় ট্রলি মেলেনি। বাধ্য হয়ে শিশুটিকে কোলে নিয়েই স্বজনদের ওয়ার্ডের দিকে ছুটতে হয়েছে। পরে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে শিশুটির মৃত্যু হয়।
এই গল্প ফরিদপুর সদর উপজেলার কানাইপুর ইউনিয়নের হোগলাকান্দি গ্রামের রবিন শেখের মেয়ে মারা যাওয়া মৃত শিশু সাফা মারওয়ার। গত সোমবার রাত ১১টার দিকে সাফা মারওয়াকে নিজ এলাকায় দাফন দেওয়া হয়।
তখন তার স্বজনরা জানান, শিশু সাফা মারুয়াকে বাড়ির সামনের সড়ক থেকে একটি অটোরিকশা চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে দ্রুত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন পরিবারের সদস্যরা। চিকিৎসকের কাছে দ্রুত পৌঁছানোর জন্য জরুরি বিভাগ থেকে একটি ট্রলির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অভিযোগ ওঠে, এ সময় ট্রলি চাইলে টাকা দাবি করা হয়। তাৎক্ষণিক টাকা দিতে না পারায় ট্রলি থেকে বঞ্চিত হন স্বজনরা। শেষমেশ কোনো উপায় না দেখে শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়েই অক্সিজেন ও স্যালাইন ঝুলিয়ে জরুরি বিভাগের দিকে দৌড়াতে হয় স্বজনদের।
শিশুটির পিতা রবিন শেখ গত মঙ্গলবার বিকেলে একবুক কষ্ট নিয়ে বলেন, অটোরিকশা চাপা দিলে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাই, প্রথমে ইমার্জেন্সি থেকে অক্সিজেন ও স্যালাইন পুশ করানো এবং পরে সেখানকার ট্রমা সেন্টার থেকে হাতে ব্যান্ডেজ করানো হয়। ৩ বছরের এই শিশুকে এখান থেকে ওখানে নেওয়ার জন্য ট্রলি দরকার হলেও আমরা হাসপাতালে ট্রলি পাইনি। আমার বাচ্চাটা এমন কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, কিন্তু নার্সরা কি স্বাভাবিক গল্পগুজবে মশগুল। আমাদের চিল্লাচিল্লিতে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
তিনি আরও বলেন, এমন মুমূর্ষ রোগীকে ডাক্তাররা তেমন কোন চিকিৎসা না দিয়েই ঢাকা রেফার করে দিলেন। এত অসুস্থ মানুষ নিয়ে ঢাকায় যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমার তিন বছরের মেয়েটি পথেই গাড়ির মধ্যে মারা গেল। এই কষ্টের কথা আমি কাকে বলব!
তবে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহের জন্য ট্রলির টাকা না দেওয়ায় তাদের ট্রলি দেওয়া হয়নি বলে যে অভিযোগ, তা অস্বীকার করেন হাসপাতালের উপ-পরিচালক মানষ কৃষ্ণ কুণ্ডু।
তিনি বলেন, এ অভিযোগ পাওয়ার পর আমি সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের দায়িত্বরত নার্স ও ওয়ার্ড বয়দের সঙ্গে কথা বলেছি, রোগীর স্বজনদের অভিযোগ সঠিক নয়। শিশুটির শারীরিক অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, তাই ট্রলিতে তাকে নেওয়া হলে তা আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতো বলে নার্সরা শিশুটিকে ট্রলিতে নিতে বারণ করেছে। এর বেশি কিছু নয়।
পেটে গজ রেখে সেলাই
এর আগে সিজারের সময় নার্স বীথি আক্তারের পেটে গজ রেখেই সেলাই করে দেন চিকিৎসক। তারপর সেই গজ পেটের মধ্যে পচে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৮টায় ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। বীথি আক্তার রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের জামতলার হাট জ্যেতিনবর্দিপাড়া গ্রামের রাকিবুল ইসলামের স্ত্রী এবং ফরিদপুর শহরের একটি নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী ছিল। পাশাপাশি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে কাজ করতেন।
মৃত বীথির পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ৬ মে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বীথির অস্ত্রোপচার করেন ডা. তামান্না আক্তার ও ইন্টার্ন চিকিৎসক অরবিন্দু। ওই সময় তিনি পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। এর পাঁচ দিন পরে হাসপাতাল ছেড়ে স্বামীর বাড়িতে চলে যান বীথি। এরপর থেকে অসুস্থতাসহ নানা জটিলতা দেখা দেয় তার।
একপর্যায়ে অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেও গুরুতর কোনো সমস্যা হয়নি বলে তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে প্রায় দেড় মাস পর দুই দফায় দুটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে আল্ট্রাসনোগ্রাম দেখা যায়, তার পেটের মধ্যে গজ কাপড় রয়েছে।
এরপর গত ১২ জুলাই ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয় তাকে। এর তিন দিন পর ১৫ জুলাই সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফজলুল হক শোভন ও সঞ্জয় সাহা তার দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার করে গজ কাপড় বের আনেন। তখন তার পেটের নাড়ি পচে সংক্রমণ দেখা দেয়। পরবর্তীতে ২২ জুলাই তাকে ছাড়পত্র দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরমধ্যে পেটের মধ্যে সংক্রমণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকলে গত ২ অক্টোবর বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল বিথী নিজেই। পরে তার চিকিৎসা ও শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগও করেন স্বজনরা।
আশঙ্কাজনক অবস্থায় গত ৪ অক্টোবর ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয় বিথী আক্তারকে। ঢাকা নেওয়ার পরে আরও অবনতি হতে থাকে এবং চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৮ অক্টোবর সকালে মারা যান বিথী। ওই দিনই দুপুরে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় বীথির মরদেহ। জানাজা শেষে দাফন করা হয়।
এ বিষয়ে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত পরিচালক) মানস কৃষ্ণ কুণ্ডু জানান, বীথির চিকিৎসার জন্য আমরা মেডিকেল বোর্ড গঠন করেছিলাম, তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকায় পাঠানো হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বিথী।
উপ-পরিচালক আরও জানান, বিথীর চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছে কি না সে বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাসকে প্রধান করে ৬ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। আগামী ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে তদন্ত কমিটিকে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে সোমবার (১২ অক্টোবর) দুপুর ১২টা থেকে হাসপাতালের নানা অব্যবস্থাপনার বিষয়টি আমলে নিয়ে হাসপাতালে অভিযান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক। দুদকের সহকারী পরিচালক মো. মুস্তাফিজ বলেন, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগত রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে হয়রানি ও দালালচক্রের মাধ্যমে রোগীদের বিভিন্ন ক্লিনিক ও প্রাইভেট হাসপাতালে পাঠানো এবং আউটসোর্সিং কর্মচারী নিয়োগসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন ফরিদপুর কার্যালয় থেকে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিযান শেষে আমরা বিস্তারিত জানাব এবং অভিযানে যদি কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়, সে তথ্য আমাদের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হবে। আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পরবর্তী কার্যক্রম চালিত হবে।
প্রতিনিধি/এলএ




