একসময় মাছ কাটার পর পেটের ভেতর থেকে বের হওয়া সাদা শক্ত অংশটি ফেলে দিতেন ব্যবসায়ীরা। এখন সেই ফেলনা অংশই হয়ে উঠেছে বাড়তি আয়ের উৎস। সামুদ্রিক মাছ কাটলফিশের অভ্যন্তরীণ খোলস ‘কাটলবোন’ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাত ও বিক্রির মাধ্যমে পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় গড়ে উঠেছে নতুন বাণিজ্য। পোষা পাখির ক্যালসিয়ামের উৎস হিসেবে এর চাহিদা থাকায় প্রতি কেজি কাটলবোন বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। মাসে শত শত কেজি কাটলবোন বেচাকেনার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে সম্ভাবনাময় একটি বাজার।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গভীর বঙ্গোপসাগর থেকে আহরণ করা কাটলফিশ আলিপুর-মহিপুর মৎস্য বন্দরে নিয়ে আসেন জেলেরা। সেখান থেকে মাছ কিনে কুয়াকাটার ফিশ ফ্রাই মার্কেটের ব্যবসায়ীরা পর্যটকদের জন্য ফ্রাই ও বারবিকিউ তৈরি করেন। মাছ কাটার সময় পেটের ভেতর থেকে পাওয়া সাদা, হালকা ও শক্ত অংশটি আগে ফেলে দেওয়া হলেও এখন তা সংগ্রহ করে বিক্রি করা হচ্ছে।
কাটলফিশের এই বিশেষ অভ্যন্তরীণ কাঠামোর নাম কাটলবোন (Cuttlebone)। এর ভেতরে অসংখ্য ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠ রয়েছে, যা পানির নিচে কাটলফিশের ভাসমানতা ও শরীরের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। ক্যালসিয়াম কার্বোনেটসমৃদ্ধ এই উপাদান শুকিয়ে পোষা পাখির ক্যালসিয়ামের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
কুয়াকাটার স্থানীয় কাটলবোন সংগ্রহকারী ও বিক্রেতা মো. ইসা জানান, ফিশ ফ্রাই মার্কেটের বিভিন্ন দোকান থেকে তিনি কাটলফিশের পেটের ভেতর পাওয়া সাদা অংশ সংগ্রহ করেন। পরে বাড়িতে নিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করে রোদে শুকানোর পর ঢাকার পাখি বিক্রেতারাতার কাছ থেকে প্রতি কেজি ৬০০ টাকা দরে কিনে নেন। প্রতি মাসে প্রায় ১৮০ থেকে ২০০ কেজি কাটলবোন সংগ্রহ ও বিক্রি করতে পারেন।
কুয়াকাটা ফিশ ফ্রাই মার্কেটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. কাওসার বলেন, আমাদের মার্কেটে প্রায় ৩০টি দোকান রয়েছে। প্রতিদিন এখানে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কেজি কাটলফিশ বিক্রি হয়। ছোট-বড় প্রতিটি কাটলফিশের পেটেই কমবেশি এই সাদা অংশ পাওয়া যায়। আগে এগুলো ফেলে দেওয়া হতো। এখন পাখির দোকানদাররা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
কাটলবোনের এই বাণিজ্যে যুক্ত হয়েছেন পোষা পাখির দোকানিরাও। কুয়াকাটা অ্যাকুয়ারিয়াম অ্যান্ড পাখি ঘরের স্বত্বাধিকারী আলামিন শরিফ বলেন, ফিশ ফ্রাই মার্কেটের দোকানগুলো থেকে তিনি প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে কাটলবোন কেনেন। তবে সংগ্রহের পর সরাসরি পাখিকে দেওয়ার আগে সেগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার করে রোদে শুকাতে হয়।
আলামিন শরিফ বলেন, কাটলবোন পুরোপুরি শুকিয়ে গেলে পাখির খাবার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। বিশেষ করে পাখির ডিম দেওয়ার সময় এর চাহিদা বাড়ে। বাজরিগার, ককাটেল ও লাভবার্ডের মতো পাখির খাঁচায় আস্ত কাটলবোন ঝুলিয়ে রাখা হয়। পাখি ঠোঁট দিয়ে ঘষে এর অংশ খেতে পারে। আবার শুকনো কাটলবোন গুঁড়া করেও পাখির খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়।
বরিশালের রূপাতলী এলাকার পাখিপ্রেমী রায়হান আলভি বলেন, শখের বশে সাত বছর আগে পাখি পালন শুরু করলেও এখন ধীরে ধীরে তা বাণিজ্যিক পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। পাখির ক্যালসিয়ামের উৎস হিসেবে কাটলবোন ব্যবহার করেন। কুয়াকাটা ও পাখির দোকান থেকে এটি সংগ্রহ করেন।
কাটলবোনের ব্যবহার শুধু পাখির খাবারেই সীমাবদ্ধ নয়। ‘সুস্থ সাগর’ প্রকল্পের গবেষণা সহকারী মো. বখতিয়ার রহমান বলেন, কাটলবোন মূলত ক্যালসিয়াম কার্বোনেটসমৃদ্ধ। পোষা পাখির ক্যালসিয়ামের উৎস হিসেবে এর ব্যবহার প্রচলিত। এ ছাড়া এর নরম ও ছিদ্রযুক্ত গঠন কাজে লাগিয়ে গয়না ও ছোট ধাতব বস্তু তৈরিতে ছাঁচ হিসেবেও এটি ব্যবহার করা হয়।
কলাপাড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী বলেন, কাটলবোন মৎস্যসম্পদের সম্ভাবনাময় একটি উপজাত। এটি কাজে লাগিয়ে জেলে ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারেন। এ বিষয়ে জেলেরা আগ্রহী হলে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
একসময় ফেলে দেওয়া কাটলবোন এখন কুয়াকাটার ব্যবসায়ীদের কাছে মূল্যবান সম্পদ। সঠিকভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বাজারজাত করা গেলে সামুদ্রিক এই উপজাত স্থানীয় অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারে।




