বরিশাল সরকারি বিএম কলেজ থেকে মাস্টার্স পাস করা মেধাবী ছাত্রী ঝুমুর খানম সেতুর (২৭) অস্বাভাবিক মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে অভিযোগ করেছেন তার পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা। তাদের দাবি, প্রবাসী স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতনের একপর্যায়ে বিষপানে বাধ্য হয়ে মারা গেছেন ঝুমুর।
ময়নাতদন্ত শেষে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাতে ঝুমুরের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রাত ৯টার দিকে মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স আগৈলঝাড়ার উত্তর শিহিপাশা গ্রামের বাবার বাড়িতে পৌঁছালে সেখানে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। রাত ১০টার দিকে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে ঝুমুরের দাফন সম্পন্ন হয়।
জানাজায় উপস্থিত স্বজন ও এলাকাবাসী ঝুমুরের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
জানা যায়, ঝুমুর খানম সেতু আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের উত্তর শিহিপাশা গ্রামের আব্দুল করিম খানের মেয়ে । বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণা ও নিজের প্রচেষ্টায় তিনি বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ থেকে মাস্টার্স পাস করেন। পরে সামাজিকভাবে গৌরনদী পৌর এলাকার চরগাধাতলী গ্রামের মৃত হারুন কাজীর ছেলে শাহারিয়া কাজী ওরফে শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।
ঝুমুরের বাবা আব্দুল করিম খান অভিযোগ করেন, বিয়ের পর থেকেই তার মেয়েকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মানসিক নির্যাতন করতেন স্বামী শাহারিয়া, শাশুড়ি রুনু বেগম, ননদ নাজমিন বেগম, শারমিন ও রিয়া খানম এবং নাজমিনের স্বামী সাইদুল হাওলাদার। বিয়ের সময় পর্যাপ্ত মালামাল না দেওয়া, বরযাত্রী বেশি না আনা এবং ঝুমুর দেখতে সুন্দরী নন—এমন নানা অজুহাতে তাকে হেয় করা হতো বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ঝুমুরের স্বামী শাহারিয়া বর্তমানে কুয়েতে কর্মরত। করিম খানের অভিযোগ, দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের প্ররোচনায় বিদেশে থেকেও শাহারিয়া তার মেয়ের ওপর মানসিক নির্যাতন চালাতেন। একপর্যায়ে ঝুমুরকে তার একমাত্র মেয়েসহ স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর থেকে মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতেই থাকতেন তিনি।
করিম খান বলেন, গত ৪ অক্টোবর রাতে ভিডিও কলে ঝুমুরকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন তার স্বামী। একপর্যায়ে তাকে বিষপান করে মারা যেতে বলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এরপর পরিবারের সদস্যদের অজান্তে বিষপান করেন ঝুমুর। মুমূর্ষু অবস্থায় প্রথমে তাকে আগৈলঝাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে ওই রাতেই বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে ৫ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। স্বজনরা অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ঢাকায় নিয়ে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওইদিন বিকেল ৫টার দিকে মারা যান ঝুমুর।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, বিষপানের পর আগৈলঝাড়া, বরিশাল ও ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় এবং মৃত্যুর পর দাফন পর্যন্ত ঝুমুরের স্বামীর পরিবারের কোনো সদস্য তার পাশে ছিলেন না।
এ বিষয়ে আগৈলঝাড়া থানার ওসি মোহাম্মদ মাসুদ খান বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিহতের পরিবারের করা অভিযোগের বিষয়ে ঝুমুরের স্বামী শাহারিয়া কাজী ওরফে শাহাবুদ্দিনের পরিবারের কোনো সদস্য বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
এদিকে, কয়েক মাস আগে ঝুমুরের ২০ বছর বয়সী একমাত্র ভাই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ভাইয়ের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই ঝুমুরের অস্বাভাবিক মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
প্রতিনিধি/টিবি




