রোববার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

ভরাট হচ্ছে হাকালুকি, হারিয়ে যাচ্ছে বিল

জেলা প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার
প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৯ পিএম

শেয়ার করুন:

ভরাট হচ্ছে হাকালুকি, হারিয়ে যাচ্ছে বিল
হাকালুকি হাওর

কাগজে-কলমে বিলের সংখ্যা ২৩৮। কিন্তু বাস্তবে এর অনেকগুলোর অস্তিত্বই নেই। পলি ও বালু জমে ভরাট হয়েছে বিল। যেগুলো এখনো টিকে আছে, সেগুলোর অনেকটিতে কমছে পানির গভীরতা। কোথাও কোথাও কয়েক বছর আগের তুলনায় পানির গভীরতা অর্ধেকের কাছাকাছি নেমে এসেছে বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি।

এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ মিঠাপানির জলাভূমি ও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হাকালুকি হাওরের এমন চিত্র উঠে এসেছে স্থানীয় বাসিন্দা, মৎস্যজীবী, পরিবেশকর্মী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে।

হাওরের সঙ্গে সংযুক্ত জুড়ী, সুনাই ও ফানাইসহ বিভিন্ন নদী এবং পাহাড়ি ছড়া দিয়ে আসা পলি-বালু ও বর্জ্য জমছে হাওরের বিভিন্ন বিল ও জলাধারে। পাশাপাশি অতিরিক্ত মাছ শিকার হচ্ছে। কৃষিজমিতে কীটনাশকের ব্যবহার, অপরিকল্পিত বাঁধ-রাস্তা নির্মাণ এবং হাওরের জায়গা দখলের অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের।

1000246490

হাওর এলাকার বাসিন্দারা জানান, হাকালুকি হাওর পারের লাখ লাখ মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস। হাওরে মাছ শিকার করে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করেন, আবার অনেকে নির্ভর করেন কৃষির ওপর। তবে কয়েক বছর ধরে হাওরের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। নির্বিচারে সেচ দিয়ে মাছ শিকার, কৃষি জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং হাওরের জায়গা দখলের কারণে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব কারণে ধীরে ধীরে হাকালুকি হাওর তার স্বাভাবিকতা হারাচ্ছে। হাওর রক্ষায় সরকারি উদ্যোগে হাওর উন্নয়ন বোর্ড গঠন করা হলেও মাঠপর্যায়ে এর কার্যক্রম তেমন দৃশ্যমান নয়। সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকিতেও দেখা যায় না বলে অভিযোগ তাদের।

1000246486

জানা গেছে, মৌলভীবাজারের বড়লেখা, কুলাউড়া, জুড়ী, এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ এবং বিয়ানীবাজার উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত এই হাওর। জুড়ী, ফানাই, সুনাইসহ ১০টি নদী এবং অসংখ্য পাহাড়ি ছড়া হাওরের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে। জুড়ী, সুনাই ও ফানাই নদী এই বিশাল হাওরের মূল প্রবাহ। সময়ের সঙ্গে পলি বালু জমে প্রায় শতাধিক বিল ভরাট হয়ে গেছে। কাগজে কলমে ২৩৮টি বিল থাকলেও প্রায় অর্ধেক বিলের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যেগুলো অবশিষ্ট আছে এগুলোও ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বছর কয়েক আগে যেসব বিলের নাব্যতা ৩৫-৩০ ফুট গভীর ছিল এগুলো এখন কমে ১৫-২০ ফুট চলে এসেছে। এখনও যেসব বিল আছে এগুলো খনন না করলে আগামী একদশকে ভরাট হয়ে যাবে।

এছাড়া ১৮ হাজার হেক্টর হাওরের আয়তন লেখা থাকলেও বাস্তবে কতটুকু আছে তা কেউ জানে না। হাওর পাড়ের বাসিন্দারা অনেকেই ঘরবাড়ি করে হাওর দখল করে নিয়েছেন এমন অভিযোগ রয়েছে।

1000246506

জুড়ী উপজেলার হাওরপারের বাসিন্দা রায়হান আহমেদ বলেন, জুড়ী উপজেলা বাজারে বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলছেন। এসব বর্জ্য জুড়ী নদী দিয়ে সরাসরি হাওরে গিয়ে পড়ছে। হাওরের সঙ্গে সংযুক্ত অন্যান্য নদী ও ছড়া দিয়েও বর্জ্য প্রবেশ করছে।

হাওরপারের মৎস্যজীবী ফয়েজ মিয়া বলেন, আগের তুলনায় হাওরে মাছ কমে গেছে। পানির নিচে হাত দিলে অনেক সময় প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য পাওয়া যায়। আগে কোনো কোনো এলাকায় ১৫ থেকে ২০ ফুট পর্যন্ত পানি পাওয়া গেলেও এখন সেখানে ৫ থেকে ৭ ফুট পানিও পাওয়া যায় না।

স্থানীয় পরিবেশকর্মী নাজমুল ইসলাম বলেন, কয়েকটি কারণে হাকালুকি হাওরের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হচ্ছে। হাওরের ভেতরে অপরিকল্পিত বাঁধ ও রাস্তা নির্মাণের কারণে কোথাও কোথাও পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উজান থেকে আসা বালু ও পলি জমে হাওরের তলদেশ উঁচু হচ্ছে। এর সঙ্গে প্লাস্টিকসহ নানা ধরনের বর্জ্যও যুক্ত হচ্ছে।

1000246511

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদ সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, হাকালুকি হাওর বর্তমানে নানা সংকটে রয়েছে। হাওরের বিলগুলো জরুরি ভিত্তিতে খনন, দখল হওয়া জায়গা চিহ্নিত করে তা উদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়াও জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণ এবং হাওরে প্রবেশের মুখের নদী ও ছড়া খনন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বর্তমানে বাস্তবে কতগুলো বিল টিকে আছে, তার সঠিক হিসাব করা দরকার।

মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম বলেন, হাকালুকি হাওরে বর্জ্য যাওয়ার বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তরকে জানানো হলে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে জনবল সংকটের কারণে সব জায়গায় নিয়মিত যাওয়া সম্ভব হয় না বলেও জানান তিনি।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. আরিফ হোসেন বলেন, হাওরে ৬০ শতাংশ বিল ইজারা দেওয়া হলেও বাকি বিলগুলো ভরাট হওয়ার কারণে ইজারা দেওয়া যাচ্ছে না। কাগজে কলমে হাকালুকি হাওরে ২৩৮টি বিল আছে। তবে বাস্তবে অনেক বিল ভরাট হয়ে গেছে। বিল ভরাট হওয়ার কারণে হাওরে পানি থাকে না। গত বছর হাওরে যে পরিমাণ মাছ পাওয়া গেছে এই বছর তাও মিলবে না।

প্রতিনিধি/টিবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর