মৌলভীবাজারের বড়লেখায় অবস্থিত মালাম বিল রক্ষায় রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। বিলের জলাবন থেকে গাছকাটা, স্থাপনা নির্মাণ ও বিলের শ্রেণি পরিবর্তন রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতা ও বিলটি পুণরায় ইজারা প্রদান সংবিধান ও আইনের পরিপন্থী হওয়ায় কেন তা বেআইনি ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে এই রুল জারি করা হয়।
সোমবার (১৫ জানুয়ারি) এ বিষয়ে এক আবেদনের শুনানি করে বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি মো. আতাবুল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রুল জারি করেন।
রুলে হাকালুকি হাওরের সীমানা নির্ধারণ, নির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, আহরণমূলক ও ক্ষতিকারক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ধারা ৫ এর বিধান অনুযায়ী হাওরটিকে রক্ষা ও সংরক্ষণের নির্দেশ কেন প্রদান করা হবে না তাও জানতে চেয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক কর্তৃক বিগত ২৫ অক্টোবর, ২০২০ সালে মনাদী মৎসজীবী সমিতি বরাবর প্রদানকৃত ইজারা বাতিল চেয়ে বেলা কর্তৃক প্রেরিত চিঠি নিষ্পত্তির আদেশ প্রদান করেন আদালত।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলার) পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট এস হাসানুল বান্না। তাকে সহযোগিতা করেন অ্যাডভোকেট শামীমা নাসরিন। অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সেলিম আযাদ সরকার।
উল্লেখ, দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকি মৌলভীবাজারের বড়লেখা, জুড়ি, ও কুলাউড়া উপজেলা এবং সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোপালগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত। এটি দেশের অন্যতম প্রধান মিঠা পানির বন।
বিগত ১৯৯৯ সালের ১৯ এপ্রিল এই হাওরের ১৮ হাজার ৩৮৩ (আঠারো হাজার তিনশত তিরাশি) হেক্টর এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ঊপড়ষড়মরপধষ ঈৎরঃরপধষ অৎবধ - ঊঈঅ) ঘোষণা করা হয়। এই হাওরে ছোট-বড় অনেক বিল রয়েছে যার মধ্যে মালাম বিল অন্যতম। মালাম বিলটি বড়লেখা উপজেলার তালিমপুর ইউনিয়নের দ্বিতীয়ারদেহী-৮৩ মৌজার এস এ ৫৪ ও ১০৮ দাগে অবস্থিত যার আয়তন ৪২৮ দশমিক ৯২ একর। বিলটি বদ্ধ জলমহাল হিসেবে ৫ বছর মেয়াদে (১৪২৭-১৪৩২ বঙ্গাব্দ) জেলা প্রশাসক মানাদী মৎসজীবী সমবায় সমিতি বরাবর মৎস্য চাষের উদ্দেশ্যে ইজারা প্রদান করে। পরিবেশ অধিদফতরের পরিদর্শন ও বড়লেখা ভূমি অফিসের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ইজারা চুক্তি লঙ্ঘন করে বিলের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট ও পরিবেশ অধিদফতর কর্তৃক সৃজিত বিভিন্ন প্রজাতির জলজ বৃক্ষ (হিজল, করচসহ অন্যান্য জলজ প্রজাতি) কেটে মানাদী মৎসজীবী সমবায় সমিতি ২ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ ও ১০-১২ বিঘা জমি চাষ উপযোগী করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতর বড়লেখা থানায় ৭ জনকে অভিযুক্ত করে একটি মামলা দায়ের করলেও পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার বৈশিষ্ট্য নষ্ট করে জলজ প্রজাতির বৃক্ষ নিধন ও বাঁধ নির্মাণের ষ্পষ্ট অভিযোগ থাকলেও মামলায় ইজারা গ্রহীতাকে বিবাদী করা হয়নি এবং ইজারা চুক্তি বাতিল করা হয়নি।
পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষিত হাকালুকি হাওর ও মালাম বিল রক্ষায় বেলা উল্লেখিত মামলাটি দায়ের করে। এতে বিবাদী করা হয় ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব; পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব; জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান; পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক; বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদফতরের মহাপরিচালক; বন অধিদফতরের প্রধান বন সংরক্ষক; মৌলভীবাজার ও সিলেটের জেলা প্রশাসক; মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার; পরিবেশ অধিদফতর, সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক; সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা; মৌলভীবাজারের বন কর্মকর্তা (বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ); মৌলভীবাজারের বড়লেখার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা; পরিবেশ অধিদফতর, মৌলভীবাজার জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক; বড়লেখা পুলিশ স্টেশনের অফিসার ইনচার্জ; বড়লেখা ইউনিয়নের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা এবং মনাদি মৎস্যজীবি সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি।
এআইএম/এইউ




