চট্টগ্রাম মহানগরীর সড়কের পাশে দাঁড়ালেই এখন চোখে পড়ছে সবুজ-সোনালি আখের সারি। কোথাও রাস্তার ধারে বাঁশের খুঁটির সঙ্গে ঠেস দিয়ে সাজানো আখের গোছা, কোথাও ভ্যানভর্তি আখ নিয়ে বিক্রি করছেন ক্ষুদ্র বিক্রেতা। পথচারীরা থামছেন, কেউ দরদাম করে কিনছেন, কেউ দাঁড়িয়ে মিষ্টি আখের রসের স্বাদ নিচ্ছেন।
নগরীর কোতোয়ালীর ফিরিঙ্গীবাজার এলাকার সবজি-ফলের আড়তে এই সময়ের নতুন পণ্য হিসেবে প্রতিদিন ট্রাকে ট্রাকে আসছে আখ। সেখানে আখ নিয়ে এখন রাতদিন ব্যস্ততা। বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা ট্রাকে করে আখ নিয়ে আসেন এখানে, নামিয়ে রাখা হয় আড়তে, সেখান থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে পুরো শহরে বিক্রি করেন।
‘শহর ভরপুর’ করা এই আখের শেকড় বা উৎস মূলত চট্টগ্রামের ৫টি উপজেলায়; যে এলাকার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে কয়েকটি বড় নদী ও খাল। দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, বোয়ালখালী, বাঁশখালী এবং উত্তর চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া আর দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের নদীর তীরবর্তী এলাকায় গত ৫ বছর ধরে বাড়ছে আখের আবাদ, বেড়েছে ফলন।
বছরভেদে আবাদ ও উৎপাদনে কিছুটা ওঠানামা থাকলেও আখ চাষ নিয়ে কৃষকের আগ্রহ আর লাভ বাড়ছে প্রতি বছর। তারই প্রভাব পড়ছে শহর-গ্রামের আখের বাজারে। এ বছর গত প্রায় দুই মাস ধরেই বাজারে আখ পাওয়া যাচ্ছে এবং আগামী আর কয়েক মাস আখ পাওয়া যাবে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষকদের দেওয়া তথ্য মতে, এক কানি বা ৪০ শতক জমিতে প্রায় ৮ হাজার একক পিস আখ উৎপাদিত হয়। গড়ে বিক্রি হয় প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায়। সে হিসেবে হেক্টর প্রতি আখের মূল্য দাঁড়ায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। চট্টগ্রামে এ বছর ৪৪০ হেক্টর জমিতে প্রায় ৩০ কোটি টাকার আখ উৎপাদন হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, ‘চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলার প্রায় সব জায়গায় কমবেশি আখের চাষ হয়। তবে চরভূমি এবং নদীর তীরের পলিমাটি সমৃদ্ধ জমিতে আখের ফলন ভালো হয়। ’
আরও পড়ুন:
ফিলিপাইনের আখ চাষে সোহেল রানার বাজিমাত
তিনি বলেন, ‘চন্দনাইশ, সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শঙ্খ ও ডলু নদীর তীরঘেঁষা জমিতে প্রতি বছরই আখের ভালো ফলন হচ্ছে। রাঙ্গুনিয়ার কর্ণফুলী ও ইছামতী নদীর তীরেও বাড়ছে আখের আবাদ।
‘কর্ণফুলীর তীরবর্তী বোয়ালখালীতেও ধীরে ধীরে বাড়ছে উৎপাদন। বর্তমান বাজারে যে আখ আসছে তার একটি বড় অংশই চন্দনাইশের দোহাজারী এবং সাতকানিয়া এলাকা থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে।’
এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘শীতের শেষভাগে, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে জমিতে আখের চারা রোপণ করেন কৃষকরা। ৬/৭ মাস পরিচর্যার পর জুলাই থেকে শুরু হয় কাটা। এরপর সেই আখ চলে আসে স্থানীয় বাজার পেরিয়ে চট্টগ্রাম নগরে। ফলে বর্ষা থেকে শরৎ পর্যন্ত নগরের বিভিন্ন সড়ক ও বাজারে বাড়তে থাকে আখের উপস্থিতি। একদিকে মাঠে বাড়ছে আখের আবাদ, অন্যদিকে শহরের মানুষের কাছে জনপ্রিয়তাও বাড়ছে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য বলছে, চট্টগ্রামে গত পাঁচ বছরে আখের আবাদ ও উৎপাদন- দুটিই বেড়েছে। ২০২১ সালে জেলার ৩৬৬ হেক্টর জমিতে আখ উৎপাদন হয়েছিল ১৯ হাজার ৬৭ মেট্রিক টন। হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ছিল ৫২ টন। পাঁচ বছর পর ২০২৬ সালে আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪০ হেক্টরে, আর উৎপাদন বেড়ে হয়েছে ২৫ হাজার ৯২ মেট্রিক টন। হেক্টরপ্রতি উৎপাদনও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ টনে।
অর্থাৎ ২০২১ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে আখের আবাদ বেড়েছে ৭৪ হেক্টর এবং উৎপাদন বেড়েছে ৬ হাজার ২৫ মেট্রিক টন। একই সময়ে হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বেড়েছে ৬ টন। মাঝের বছরগুলোতেও আবাদ ও উৎপাদনে মোটের ওপর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।
আরও পড়ুন:
কক্সবাজারে আখ চাষে ঝুঁকছেন কৃষক
২০২২ সালে ৩৮৯ হেক্টর জমিতে আখ উৎপাদন হয় ২১ হাজার ৩৯৫ টন। হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ছিল ৫৫ টন। ২০২৩ সালে আবাদ কিছুটা কমে ৩৭১ হেক্টরে নামলেও উৎপাদন হয় ২০ হাজার ৪০৫ মেট্রিক টন, হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ছিল ৫৫ টন। এরপর ২০২৪ সালে আবাদ বেড়ে হয় ৪০৪ হেক্টর এবং উৎপাদন ২২ হাজার ৪০৫ মেট্রিক টন। ২০২৫ সালে আবাদ আরও বেড়ে ৪৪০ হেক্টরে পৌঁছে এবং উৎপাদন হয় ২৪ হাজার ৪০৫ মেট্রিক টন। চলতি বছর একই পরিমাণ জমিতে উৎপাদন বেড়ে হয়েছে ২৫ হাজার ৯২ মেট্রিক টন।
এই পরিসংখ্যানের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা চন্দনাইশের। বছরের পর বছর জেলার সর্বোচ্চ আখ আবাদ হচ্ছে এ উপজেলায়। ২০২১ সালে চন্দনাইশে ১৩০ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছিল। হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ছিল ৫৮ টন।
২০২৪ ও ২০২৫ সালে আবাদ ছিল ১২০ হেক্টর করে। তবে চলতি বছর আবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০ হেক্টরে। চন্দনাইশের পর আবাদে কয়েক বছর রাঙ্গুনিয়ার অবস্থান ছিল দ্বিতীয় এবং সাতকানিয়া তৃতীয়।
২০২১ সালে রাঙ্গুনিয়ায় ৫৫ ও সাতকানিয়ায় ৫০ হেক্টর জমিতে আখ আবাদ হয়। তবে চলতি বছর চিত্রে পরিবর্তন এসেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে বাঁশখালী, সেখানে এবার ৬০ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছে।
চন্দনাইশের দোহাজারী জামিজুরি এলাকার কৃষক মো. কাশেম বলেন, ‘এবার ৫ কানি (দুই একর) জমিতে আখ চাষ করেছি। কানি প্রতি চাষের খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এখন কানি প্রতি মাঠেই বিক্রি হচ্ছে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত।
‘ফলে খরচ বাদ দিয়ে হাতে কানিপ্রতি ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা লাভ থাকছে।’
অবশ্য মাঠে আখ বিক্রির হিসাব আর শহরের আড়তের হিসাব এক নয়। উৎপাদনের সরকারি হিসাব হয় মেট্রিক টনে কিন্তু চট্টগ্রাম শহরের আড়তে আখ বিক্রি হয় শ’ হিসেবে। আকারভেদে একশ আখের দাম পড়ে প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা।
ফিরিঙ্গী বাজারের আড়তে প্রতিদিন শত শত ট্রাক আখ আসছে। এর বড় অংশই আসে চন্দনাইশের দোহাজারী ও সাতকানিয়া থেকে। পাশাপাশি বাঁশখালী ও রাঙ্গুনিয়া থেকেও আখ আসছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর চট্টগ্রাম জেলার উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আপ্রু মারমা বলেন, ‘নদীতীরবর্তী পলিমাটির জমি, পর্যাপ্ত রোঁদ ও জমির উর্বরতা আখের ফলনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। চট্টগ্রামে গত কয়েক বছরে আখের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির পরিসংখ্যানও সেই প্রবণতারই প্রতিফলন।
‘আখ চাষে এখন বেশ ভালো মুনাফা করতে পারছেন কৃষকরা। এ কারণে অনেকে আখ চাষে ঝুঁকছেন। সরকারি পক্ষ থেকে আখচাষীদের বিভিন্ন ধরনের তথ্য সহায়তা দেওয়া হয়।’
আখের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের ক্লিনিক্যাল পুষ্টিবিদ এবং ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনসালট্যান্ট (ডায়েট ও নিউট্রিশন) হাসিনা আকতার লিপি বলেন, ‘আখের রস একটা উপকারী পানীয়। ১০০ গ্রাম আখের রসে ৪৯ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে খুব ভালো পরিমাণে ভিটামিন, খনিজ লবণ আর প্রাকৃতিক চিনি থাকায় এটি আসলে একটি খুব শক্তিদায়ক।
‘শরীরে দুর্বলতা দূর করতে এটা খুব ভালো কাজ করে। আর লিভারের সুস্থতা, বিশেষ করে জন্ডিস রোগে বেশ ভালো উপকার হয়। গরমের দিনে এই পানীয়টা আমাদের পানিশূন্যতা দূর করে, দেহকে হাইড্রেট মুক্ত রাখে। তবে অনেক প্রাকৃতিক চিনি থাকায় এটি খুব ক্যালরিবহুল। এটা ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য একেবারেই নিষেধ।’
তিনি বলেন, ‘আখের বিষয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে রাস্তার ধারে যে আখের রস করার যন্ত্র দেখতে পাই, সেখান থেকে রস খাওয়া উচিত নয়। কারণ, আমরা দেখতে পেয়েছি যে ওই প্রক্রিয়ায় প্রচুর জীবাণু থাকে; যা থেকে পানিবাহিত রোগ ছড়ায়। চটপটির তেঁতুলের পানি থেকে যেভাবে ছড়ায় ঠিক এভাবেই ছড়ায়। সে জন্য আস্ত আখ চিবিয়ে খাওয়া উচিত, তাতে দাঁতের উপকারিতাও মিলবে।’ সূত্র- বাসস
এএম




