পতিত জমি আর পড়ে নেই। বাড়ির আমবাগানের ফাঁকা জায়গায় সারি সারি বস্তা। প্রতিটি বস্তায় বেড়ে উঠছে সবুজ আদার গাছ। দূর থেকে দেখলে মনে হবে কোনো আধুনিক নার্সারি। কিন্তু এটি কোনো বাণিজ্যিক খামার নয়; হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার বারআউলিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদের বাড়ির আঙিনার চিত্র। পতিত জমিকে কাজে লাগিয়ে বস্তায় আদা চাষ করে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছেন তিনি।
প্রচলিত পদ্ধতিতে জমিতে আদা চাষের পরিবর্তে আধুনিক ও তুলনামূলক সহজ পদ্ধতি হিসেবে বেছে নিয়েছেন বস্তায় আদা চাষ। মাত্র কয়েক মাসের পরিচর্যায় তার বাড়ির আমবাগানের পতিত জমি এখন পরিণত হয়েছে আদার সবুজ বাগানে। তার এই উদ্যোগ শুধু নিজের বাড়তি আয়ের সম্ভাবনাই তৈরি করেনি, বরং আশপাশের কৃষকদের মধ্যেও সৃষ্টি করেছে নতুন আগ্রহ।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ফ্লাড রিকনস্ট্রাকশন ইমার্জেন্সি অ্যাসিসটেন্স প্রজেক্ট (ফ্রিপ)-এর মাধ্যমে মসলা আদা প্রদর্শনীর আওতায় আব্দুল মজিদ বস্তায় আদা চাষ শুরু করেন। প্রথমবারের মতো তিনি প্রায় ২ হাজার বস্তায় বারি আদা-২ জাতের আদা চাষ করেন। বাড়ির আমবাগানের পতিত ও অব্যবহৃত জায়গাকে কাজে লাগিয়ে শুরু করা এই উদ্যোগ এখন তার পরিবারের জন্য বাড়তি আয়ের বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
সরেজমিনে বারআউলিয়া গ্রামে কৃষক আব্দুল মজিদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আমবাগানের ফাঁকা জায়গাজুড়ে সারি সারি বস্তা। প্রতিটি বস্তায় আদার গাছ সতেজভাবে বেড়ে উঠেছে। নিয়মিত পরিচর্যা, প্রয়োজন অনুযায়ী সার প্রয়োগ ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক।
আব্দুল মজিদ জানান, ২ হাজার বস্তায় আদা চাষ করতে তার প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এ খরচের মধ্যে বস্তা প্রস্তুত, মাটি ও অন্যান্য উপকরণ, পরিচর্যাসহ বিভিন্ন খরচ রয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস থেকেও তিনি সার, কীটনাশক ও রোপণের জন্য আদার বীজ পেয়েছেন।
তার প্রত্যাশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং গাছের বর্তমান বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে মৌসুম শেষে প্রায় ৩ হাজার কেজি আদা উৎপাদন হতে পারে। উৎপাদিত আদা বাজারে বিক্রি করে প্রায় ৩ লাখ টাকা পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
আরও পড়ুন:
আগাম ফুলকপির ক্ষেতে কৃষকের সোনালি স্বপ্ন
কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, বাড়ির আমবাগানের অনেক জায়গা আগে কোনো কাজে লাগত না। সেই পতিত জায়গায় বস্তায় আদা চাষ করে তিনি এখন ভালো ফলনের আশা করছেন। অল্প জায়গায় বস্তা বসিয়ে চাষ করা যায় বলে এ পদ্ধতিটি তার কাছে সুবিধাজনক মনে হয়েছে।
তিনি আরও জানান, কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত পরিচর্যা করছেন। বিশেষ করে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শামীমুল হক শামীম তাকে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছেন।
বস্তায় আদা চাষে আব্দুল মজিদের পাশে শুরু থেকেই ছিলেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শামীমুল হক শামীম। তিনি নিয়মিত তার চাষাবাদ পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন।
শামীমুল হক শামীম বলেন, ‘চেষ্টা ও শ্রমকে কাজে লাগিয়ে কৃষক আব্দুল মজিদ পতিত জমিতে বস্তায় আদা চাষ করে সফলতা অর্জনের পথে রয়েছেন। তিনি যেভাবে অব্যবহৃত জায়গাকে কাজে লাগিয়েছেন, তা অন্য কৃষকদের জন্যও অনুকরণীয়।’
তিনি বলেন, আব্দুল মজিদের বস্তায় আদা চাষ দেখে এলাকার অনেক কৃষক এখন এ পদ্ধতির প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কেউ কেউ সরাসরি তার কাছে এসে বস্তায় আদা চাষের পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাইছেন। কৃষি অফিস থেকেও তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
একজন কৃষকের উদ্যোগ যে অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করতে পারে, আব্দুল মজিদের বস্তায় আদা চাষ তারই উদাহরণ। আগে যেখানে অনেক কৃষক বস্তায় আদা চাষের বিষয়টি তেমন জানতেন না, এখন তারা এ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করছেন।
বিশেষ করে যেসব কৃষকের জমি কম অথবা বাড়ির আঙিনা ও পতিত জায়গা রয়েছে, তাদের কাছে বস্তায় আদা চাষ আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। কারণ এ পদ্ধতিতে প্রচলিত কৃষিজমির ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে বাড়ির আঙিনা কিংবা বাগানের ফাঁকা জায়গা কাজে লাগানো যায়।
স্থানীয় কৃষকদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে কৃষি কর্মকর্তাদের কাছে এ বিষয়ে পরামর্শ নিতে শুরু করেছেন। আব্দুল মজিদের সফলতা ভালোভাবে এগোলে আগামী মৌসুমে বাহুবলের বিভিন্ন এলাকায় বস্তায় আদা চাষ আরও বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাহুবল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চিন্ময় কর অপু বলেন, বাহুবলে বস্তায় আদা চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আধুনিক এ পদ্ধতিতে তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে আদা উৎপাদন করা সম্ভব। জমির পাশাপাশি বাড়ির আঙিনা ও অন্যান্য পতিত জায়গাকেও উৎপাদনের আওতায় আনা যায়।
তিনি বলেন, ‘বস্তায় আদা চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। এ পদ্ধতিতে চাষে ঝুঁকি কম থাকায় কৃষকরা উৎসাহিত হচ্ছেন। আমরা কৃষকদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত পরামর্শসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছি।’
কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে যারা নতুন পদ্ধতিতে চাষ করতে আগ্রহী, তাদের কৃষি অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সঠিক জাত নির্বাচন, বস্তা প্রস্তুত, মাটি তৈরি, সার প্রয়োগ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে কৃষকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
গ্রামবাংলায় বাড়ির আশপাশে অনেক জায়গা বিভিন্ন কারণে বছরের পর বছর পতিত পড়ে থাকে। কোথাও থাকে ফলের বাগান, কোথাও বাড়ির সীমানা কিংবা ফাঁকা জায়গা। এসব জায়গা যদি পরিকল্পিতভাবে কৃষিকাজে ব্যবহার করা যায়, তাহলে একই জমি থেকে বাড়তি উৎপাদন ও আয় সম্ভব।
আব্দুল মজিদের উদ্যোগ সেই সম্ভাবনাকেই সামনে এনেছে। আমবাগানের গাছগুলো যেমন ফল দেবে, তেমনি গাছের নিচের ও আশপাশের ফাঁকা জায়গায় রাখা বস্তা থেকে উৎপাদিত হবে আদা। অর্থাৎ একই জায়গাকে কাজে লাগিয়ে একাধিক কৃষিপণ্যের উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন:
৮ বছরেও মেটেনি সীমানা জট, ভোগান্তি
কৃষক আব্দুল মজিদের আশা, তার এই উদ্যোগ সফল হলে আগামীতে আরও বেশি বস্তায় আদা চাষ করবেন। একই সঙ্গে এলাকার অন্য কৃষকরাও এই পদ্ধতিতে এগিয়ে আসবেন বলে তিনি মনে করেন।
কৃষকের সাফল্য শুধু তার নিজের পরিবারের অর্থনৈতিক সচ্ছলতার পথ তৈরি করে না; তা আশপাশের মানুষকেও নতুন কিছু করার সাহস জোগায়। আব্দুল মজিদের বস্তায় আদা চাষও তেমন একটি উদাহরণ। মাত্র ২ হাজার বস্তা দিয়ে শুরু করা এই উদ্যোগ এখন পুরো এলাকার কৃষকদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
কম জায়গা, সীমিত বিনিয়োগ এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শকে কাজে লাগিয়ে যদি প্রত্যাশিত উৎপাদন ও বাজারমূল্য পাওয়া যায়, তাহলে বস্তায় আদা চাষ গ্রামীণ কৃষকদের জন্য বাড়তি আয়ের একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
বিশেষ করে যেসব কৃষকের বড় আকারে জমি নেই, তাদের জন্য বাড়ির আঙিনা ও পতিত জায়গায় বস্তায় আদা চাষ নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। আর সেই সম্ভাবনার বাস্তব উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বাহুবলের বারআউলিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল মজিদ।
এক সময় যে জায়গায় শুধু আগাছা আর পতিত জমি ছিল, সেখানে এখন সবুজ আদার গাছ। সেই সবুজ পাতার ফাঁকে কৃষক আব্দুল মজিদ দেখছেন নতুন স্বপ্ন-৫০ হাজার টাকার বিনিয়োগে প্রায় ৩ লাখ টাকার সম্ভাব্য আয়। তার এই সাফল্য শুধু একজন কৃষকের গল্প নয়; এটি পতিত জমিকে কাজে লাগিয়ে কৃষিতে স্বাবলম্বী হওয়ার এক অনুপ্রেরণার গল্প।
প্রতিনিধি/এএম




