মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে অগ্রণী ব্যাংকের একটি শাখায় গ্রাহকদের অন্তত ১৪টি হিসাব থেকে ২ কোটি ২৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ক্যাশ অফিসার শরিফুজ্জামান সোহাগ কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তিনি পলাতক রয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বেলা তিনটার দিকে গ্রাহকদের আমানতের টাকা লোপাটের খবর ছড়িয়ে পড়লে শ্রীনগর শাখায় ভিড় করেন শত শত গ্রাহক। আমানতের টাকা হারানোর আশঙ্কায় ব্যাংকের মূল ফটকে তারা হট্টগোল শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন করা হয়।
খবর পেয়ে শ্রীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, শ্রীনগর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং অগ্রণী ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার দুপুরে এক নারী গ্রাহক ডিপিএস ও এফডিআরের টাকার খোঁজ নিতে ব্যাংকে আসেন। তখনই জালিয়াতির বিষয়টি সামনে আসে। পরে অনুসন্ধানে অন্তত ১৪টি হিসাব থেকে মোট ২ কোটি ২৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের তথ্য পাওয়া যায়।

ভুক্তভোগী আমানতকারীদের অভিযোগ, তারা টাকা জমা দিতে এলে ক্যাশ অফিসার শরিফুজ্জামান রশিদে স্বাক্ষর ও ব্যাংকের সিল দিয়ে ক্যাশ মেমো দিতেন। কিন্তু ওই টাকা ব্যাংকের মূল ডিজিটাল ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত না করে তিনি আত্মসাৎ করতেন।
আইভরি কোস্টপ্রবাসী মো. বাহাদুরের ভগ্নিপতি শিক্ষক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার শ্যালক বাহাদুরের হিসাবে ৮৫ লাখ টাকা জমা ছিল। হিসাব খোলার পর তিনি কোনো চেকবইও নেননি। আজ ব্যাংকে এসে দেখি, হিসাবে কোনো টাকাই নেই। প্রতারক কর্মকর্তা ব্যাংকের সিস্টেম থেকে ফোন নম্বর পরিবর্তন করে পুরো টাকা তুলে নিয়েছেন। এর মধ্যে ৩০ লাখ টাকার একটি চেক ক্যাশ অফিসার শরিফুজ্জামান নিজের নামে ইস্যু করে তুলে নিয়েছেন।’
অপর ভুক্তভোগী মনিকা বেগম বলেন, ‘আমার জীবনের সমস্ত সঞ্চয় এফডিআর হিসেবে এই ব্যাংকে জমা রেখেছিলাম। এখন এসে শুনছি, ব্যাংকের সিস্টেমে কোনো টাকাই জমা হয়নি। আমানতের টাকা এভাবে হাওয়া হয়ে গেলে আমরা কোথায় যাব?’

শ্রীনগর শাখা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্য গ্রাহকদের মধ্যে মনিকা বেগমের ৯ লাখ ৫০ হাজার, তুহিন আক্তারের ৮ লাখ, শিখা আক্তারের ১০ লাখ, নজরুল ইসলামের ১০ লাখ, স্মৃতি আক্তারের ৬ লাখ, পারভীর আক্তারের ৪ লাখ ১০ হাজার, ইসরাতুনের ২ লাখ ৩০ হাজার, যুথী আক্তারের ১ লাখ, রোজিনা বেগমের ২৭ লাখ, নজরুল ইসলামের আরও ৫ লাখ এবং মো. নাছিরের ১৫ লাখ টাকা হিসাবে জমা হয়নি অথবা জমা করা অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
শ্রীনগর শাখার ব্যবস্থাপক মো. শরীফ উদ্দিন বলেন, শরিফুজ্জামান গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) থেকে ব্যাংকে অনুপস্থিত। পরদিন বুধবার তার ঢাকার আদাবরের বাসায় লোক পাঠানো হয়েছিল। তার স্ত্রী জানিয়েছেন, নারীঘটিত একটি ঝামেলার কারণে শরিফুজ্জামান বাসা থেকে স্ত্রীর ফোনসহ বেরিয়ে গেছেন।
ব্যবস্থাপক আরও বলেন, ক্যাশ অফিসার শরিফুজ্জামান সোহাগ এই শাখায় প্রায় সাত বছর ধরে কর্মরত। এ কারণে অনেক গ্রাহকের সঙ্গে তার সখ্য তৈরি হয়েছিল। তার বাড়ি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার সোনাপোতা এলাকায়। তার বাবার নাম মো. আবুল কালাম।

অগ্রণী ব্যাংকের মুন্সিগঞ্জ অঞ্চলের উপমহাব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি প্রধান কার্যালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছি। প্রধান কার্যালয় থেকে উচ্চপর্যায়ের একটি দল আসছে এবং তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্তের পর জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ও জড়িত ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা সম্ভব হবে। তবে আমরা গ্রাহকদের আশ্বস্ত করছি, নিয়ম মেনে যাচাই-বাছাই শেষে প্রত্যেক গ্রাহকের বৈধ আমানত ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।’
শ্রীনগর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান বলেন, ‘ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা সতর্ক অবস্থানে আছি। অগ্রণী ব্যাংক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ বা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রতিনিধি/এসএস




