সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

গাজীপুরে আবাসিক চুলায় অবৈধ গ্যাস, উৎপাদন সংকটে শিল্প কারখানা

আবুল হাসান, গাজীপুর
প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:২৪ এএম

শেয়ার করুন:

গাজীপুরে আবাসিক চুলায় অবৈধ গ্যাস, উৎপাদন সংকটে শিল্প কারখানা

গাজীপুরে একদিকে আবাসিক এলাকায় চুলায় অবৈধ গ্যাস সংযোগের ছড়াছড়ি, অন্যদিকে শিল্পকারখানায় তীব্র গ্যাস সংকট। কোথাও গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে মেশিন চালানো যাচ্ছে না, কোথাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ডাইং ইউনিট। উৎপাদন সচল রাখতে শিল্পোদ্যোক্তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর। এতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, ঝুঁকিতে পড়ছে রপ্তানি আদেশ। এছাড়া প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সরেজমিনে গাজীপুরের টঙ্গী, গাছা, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, বোর্ডবাজার, পূবাইল, কালিয়াকৈর ও শ্রীপুরের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এসব শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কিন্তু উল্টো চিত্র দেখা গেছে আবাসিক এলাকায়। এখানে বৈধ আবাসিক গ্রাহকের তুলনায় অবৈধ গ্রাহক বেশি। তারা ম্যানেজ করে অবৈধ সংযোগ দিয়ে গ্যাস ব্যবহার করছেন। তিতাস কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাব, স্থানীয় দালাল ও প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম, তিতাসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এমন অনিয়ম দিনের পর দিন চলছে।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দিনের বড় একটি সময় প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় গ্যাসনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে টেক্সটাইল, ডাইং, নিটিং ও পোশাক কারখানাগুলোতে এর প্রভাব বেশি।

শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরে নিবন্ধিত শিল্পকারখানা রয়েছে ২ হাজার ১৭৬টি। এর মধ্যে পোশাক কারখানা ১ হাজার ১৮৭টি। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ৫০-৬০ ভাগ উৎপাদন নেমে আসার তথ্য পাওয়া গেছে। উৎপাদন ধরে রাখতে জেনারেটর চালিয়ে বাড়তি লাখ লাখ টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের।

শুধু উৎপাদন কমে যাওয়াই নয়, গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়ছে পুরো শিল্প সরবরাহ ব্যবস্থায়। ডাইং ও ফিনিশিং ইউনিট সময় মতো কাজ করতে না পারায় পোশাক প্রস্তুতকারক কারখানার উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রপ্তানি আদেশ নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর আশঙ্কাও করছেন উদ্যোক্তারা।

এদিকে, শিল্পাঞ্চলে এমন সংকটের মধ্যেই গাজীপুরের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ থাকার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিতাস গ্যাসের অভিযানে বিভিন্ন সময়ে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর ফের পুনঃ সংযোগ দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

ইটাহাটা এলাকায় তিতাস গ্যাসের বৈধ গ্রাহক নজরুল ইসলাম বলেন, কষ্ট হয় গ্যাস সংকটের মাঝেও আমাদের ব্যাংকে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। অবৈধ গ্রাহকদের কারণে আমরা গ্যাস পাই না।  অফিসের বসদের ম্যানেজ করে তাদের চুলা জ্বলছে।

গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় মাটির নিচ দিয়ে পাইপ বসিয়ে অবৈধ সংযোগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। নিম্নমানের পাইপ, রাইজার ও চুলা ব্যাপারে বাড়ছে দুর্ঘটনা। হতাহতের ঘটনা ঘটছে হরহামেশা। এছাড়া বিভিন্ন আবাসিক এলাকা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে অবৈধ গ্যাস সংযোগের এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এর ফলে একদিকে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে বৈধ গ্রাহক ও শিল্পকারখানাগুলো তীব্র গ্যাস সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করে একজন অবৈধ গ্রাহক বলেন, আমরা বৈধভাবে গ্যাস সংযোগ চাই। প্রয়োজনে আবাসিকে চুলার বিল বাড়িয়ে দিয়ে হলেও আমাদের সংযোগ দেওয়া হোক। এতে সরকারের গ্যাসের অপচয় কমবে, রাজস্ব বাড়বে।

অবৈধ গ্যাস সংযোগে ঝুঁকি বাড়ছে: অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার জন্য বাড়ছে দুর্ঘটনা ঝুঁকি।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) গাজীপুরের বানিয়াচালা মধ্যপাড়া এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডারের লিকেজ থেকে লাগা আগুনে প্রায় ৪৫টি ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এ সময় ঘরগুলোর আসবাবপত্রসহ অধিকাংশ মালামাল পুড়ে যায়। এতে প্রায় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন বাড়ির মালিক। আগুনের খবর পেয়ে রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা মডার্ণ ফায়ার স্টেশনের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।

স্থানীয়দের তথ্য মতে, অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে গ্যাস ব্যবহারে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। পাশাপাশি নিম্নমানের পাইপ, অনিরাপদ সংযোগ ও অনিয়ন্ত্রিত লাইন থেকে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে। তাই শুধু সংযোগ বিচ্ছিন্ন নয়, এর পেছনের নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।

গাজীপুরের কয়েকজন শিল্পোদ্যোক্তা বলেন, গ্যাসের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। জ্বালানি সংকটে উৎপাদন কমলে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ও আয়েও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই অবৈধ আবাসিক সংযোগের তালিকা তৈরি, নিয়মিত অভিযান, সংযোগদাতা চক্র শনাক্ত এবং শিল্পাঞ্চলে প্রয়োজনীয় চাপ নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।

এ ব্যাপারে ভোগড়া এলাকার স্টাইলিশ গার্মেন্টসের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আন্তরিক হস্তক্ষেপে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে। আমরা চাই নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ। কিন্তু আবাসিকে অবৈধ গ্যাস সংযোগের কারণে ২০-২৫ ভাগ গ্যাসের অপচয় হচ্ছে। দোকানপাট, হোটেল ও বাসা বাড়িতে এসব অবৈধ গ্যাস সংযোগের কারণে শিল্প কারখানায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সরকার এসব অবৈধ গ্যাস সংযোগ বন্ধে কি করছে। অবিলম্বে এসব অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা জরুরি।

 

এ ব্যাপারে তিতাস গ্যাস গাজীপুর আঞ্চলিক অফিসের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মোস্তফা মাহবুব জানান, অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অবৈধ গ্রাহকদের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের পাইপ, রাইজারসহ অন্যান্য মালামাল জব্দ করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকার ও তিতাস কর্তৃপক্ষ জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।

গাজীপুর শুধু দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল নয়, এটি তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল রপ্তানি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্র। আবাসিক চুলায় অবৈধ গ্যাসের অপচয় আর শিল্পের উৎপাদনযন্ত্রে গ্যাসের অভাব, এই বৈপরীত্য দীর্ঘায়িত হলে এর খেসারত দিতে হতে পারে পুরো অর্থনীতিকেই, মত সংশ্লিষ্টদের।

প্রতিনিধি/টিবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর