বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের চিরচেনা আমের সুদিন পেরিয়ে সারাবছরই এখন পাকা আমের মিষ্টি ঘ্রাণ মিলবে উত্তরের জেলা নওগাঁয়। আম্রপালি, হিমসাগর কিংবা ল্যাংড়ার মৌসুম মাসকয়েক আগে শেষ হলেও সাপাহার ও পোরশার জনপদে এখন হলুদ টকটকে ‘কাটিমন’ আমের পসরা সাজিয়ে বসেছেন চাষিরা। বাজারে এই আমের ব্যাপক চাহিদা থাকায় ভালো দাম পাচ্ছেন তারা। প্রচলিত নিয়ম ভেঙে অফ-সিজনে আম চাষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। সিজনবহির্ভূত এই বারোমাসি আমের বাণিজ্য কেবল চাষিদের পকেটই ভারী করছে না, বরং স্থানীয় অর্থনীতিতে রাখছে শক্তিশালী ভূমিকা।
চাষিরা জানান, সঠিক সময়ে সার, কীটনাশক ও নিয়মিত পরিচর্যা করলে কাটিমন গাছে ফলন পেতে কোনো সমস্যা হয় না। অন্য সময়ের তুলনায় অফ-সিজনে দাম বেশি পাওয়ায় লাভের পরিমাণও অনেক বেশি থাকে। স্থানীয় খুচরা ও পাইকারি বাজার ছাড়িয়ে এই আম রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় শহরে সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি সারা বছর তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থানের সুযোগ।
নওগাঁর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ২৫৫ হেক্টর জমিতে ‘কাটিমন’ আমের চাষ হয়েছে (গত বছর যা ছিল ১৯০ হেক্টর), যার মধ্যে কেবল সাপাহার উপজেলাতেই চাষ হয়েছে ১৫০ হেক্টর জমিতে। হেক্টরপ্রতি ১২ থেকে ১৫ টন ফলন ধরে এ বছর ৩ হাজার ৬০ থেকে ৩ হাজার ৮২৫ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি কাটিমন আম ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হওয়ায়, চলতি মৌসুমে প্রায় ৫৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকার আম বিক্রির সম্ভাবনা দেখছে কৃষি বিভাগ।
সরেজমিনে সাপাহারের বৃহৎ আমের বাজারে গিয়ে দেখা মিলল সিজনহীন এক উৎসবের। ভ্যানে করে সারি সারি আম নিয়ে হাজির হয়েছেন কৃষকরা। পাইকারি বাজারে প্রতি মণ আম বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকার মধ্যে। দাম ভালো পাওয়ায় এবং বাজারে অন্য কোনো আম না থাকায় চাষিদের মুখে চওড়া হাসি। স্থানীয় খুচরা ও পাইকারি বাজার ছাড়িয়ে এই আম রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় বড় শহরে সরবরাহ করা হচ্ছে।
আম বিক্রি করতে আসা হরিপুর এলাকার চাষি মনসুর আলী বলেন, ৫ বিঘা জমিতে কাটিমন চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছি। ৮ হাজার টাকা মণ দাম হাঁকলেও ব্যাপারীরা সাড়ে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বলছেন; ৭ হাজার টাকা পেলেই আম বিক্রি করার ইচ্ছে আমার।
টেংরাকুড়ি গ্রামের আম চাষি জামাল উদ্দিন বলেন, ৬০ বিঘা জমিতে কাটিমন আমের বাগান আছে। বিঘা থেকে ২০ থেকে ৩৫ মণ পর্যন্ত ফলন পাচ্ছেন। বাজারদর মণপ্রতি ৪ থেকে ৭ হাজার টাকা হওয়ায় এ বছর বাগান থেকেই ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকার আম বিক্রির আশা করছেন তিনি।
গোয়ালা ইউনিয়নের সারোগডাঙ্গার আমচাষি হাফিজুর রহমান ১৬ বিঘা জমিতে কাটিমন চাষ করেছেন। হাফিজুর রহমান বলেন, শুধু নিজে লাভবান হচ্ছি তা নয়, আমার বাগানে সারা বছর ১০-১২ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা অন্য মৌসুমি আমে সম্ভব হয় না।
নিশ্চিন্তপুর এলাকার আম চাষি নাসির উদ্দিন গত বছর ১৫ বিঘা জমিতে চাষ কাটিমন আম চাষ করে সফল হয়ে এ বছর ৩৭ বিঘায় কাটিমন চাষ করেছেন। তার বাগানেও কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন ৯ জন শ্রমিক।
স্থানীয় আম ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর বলেন, সাপাহার বাজারে কাটিমনের এমন জমজমাট বেচাকেনা আগে কখনো দেখা যায়নি। সাপাহার ছাড়াও আড্ডা, পোরশার সারাইগাছি, ধামইরহাট ও পত্নীতলা উপজেলা থেকেও কৃষকরা বিক্রির জন্য এই বাজারে আম নিয়ে আসছেন।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) রেজাউল করিম বলেন, আমাদের দেশের প্রচলিত ধারণা ছিল আম কেবল গ্রীষ্মকালের ফল। কিন্তু আধুনিক জাত যেমন ‘কাটিমন’ এবং কৃষকদের সঠিক পরিচর্যা ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ আমাদের সেই ধারণাকে বদলে দিতে বাধ্য করেছে। ষড়ঋতুর চিরায়ত নিয়মকে পেছনে ফেলে এখন বছরের নির্দিষ্ট সময়ে নয়, বরং যখন চাহিদা বেশি তখনই আম উৎপাদন করে বিপ্লব ঘটাচ্ছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। কৃষি বিভাগ থেকে আমরা এই অফ-সিজন চাষাবাদে সার্বিক প্রযুক্তিগত সহায়তা ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি, যা ভবিষ্যতে গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
প্রতিনিধি/টিবি




