নওগাঁয় ধানই ছিল চাষির ধ্যানজ্ঞান। এখন বরেন্দ্রর এই জনপদের বুকে শুধু ধান নয়, আমও ফলে। ইতোমধ্যে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আম চাষে উৎপাদনে এগিয়ে রয়েছে সীমান্তবর্তী এই জেলা। এই জেলায় বিভিন্ন জাতের আম চাষ হলেও সবচেয়ে বেশি চাষ হয় আম্রপালি। বর্ণে-গন্ধে ও খেতে সুস্বাদু-সুমিষ্টি এবং গুনগতমান ভালো হওয়ায় দেশ সেরা এখানকার আম্রপালি। বিদেশেও এই আম ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছে। তাই এই আমকে ব্রান্ডিং হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন চাষিরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর ধরে দেশে আমের জন্য সুখ্যাতি পেয়েছে এই জেলা। এবার জেলায় আমের ভালো ফলন হয়েছে। চলতি বছর জেলার ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের আম চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি আম্রপালি আমের চাষ হয়েছে। সবচেয়ে বেশি চাষ হয় সাপাহার ও পোরশা উপজেলায়। এছাড়াও নাক ফজলি, ল্যাংড়া বা হাড়িভাঙ্গা, খিরশাপাত, বারি-৪, ব্যানানা ম্যাংগোসহ দেশি-বিদেশি ১৬টি জাতের আম চাষ করেছেন চাষিরা।
নওগাঁর সবচেয়ে বড় আমের হাট সাপাহারে। চাষিরা প্রতিদিন বাগান থেকে আম সংগ্রহ করে ভ্যান, ভটভটি ও অটোরিকশায় করে বিক্রির জন্য নিয়ে আসে এই বাজারে। প্রতিদিন ভোর থেকেই শুরু হয় আম বেচাকেনা। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পাইকাররা আম কিনতে আসেন এই বাজারে। বর্তমানে চলছে আম্রপালি আমের ভরা মৌসুম। এছাড়াও বারি-৪, ফজলি ও ব্যানানা ম্যাংগো জাতের আম বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
আম্রপালি প্রকারভেদে ২০০০ টাকা থেকে ৩৫০০ টাকা, বারি-৪ জাতের আম ২৭০০ টাকা থেকে ৩২০০ টাকা, ফজলি ১৮০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা এবং ব্যানানা ম্যাংগো ৬ হাজার টাকা মণ হিসাবে বিক্রি হচ্ছে।
![]()
চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবহাওয়া ও মাটির কারণে অন্যান্য আমের থেকে এই আমের ফলনও হয় বেশি। সাধারণত আম এক বছর ফলন দেওয়ার পর পরের বছর আর ফলন দেয় না কিন্তু আম্রপালি প্রতিবছর ফলন দেয়। তাছাড়া এই গাছ খুব বেশি লম্বা হয় না। বরেন্দ্র এলাকার এঁটেল মাটির আম অত্যন্ত সুস্বাদু ও সুমিষ্ট হওয়ায় বাজারে চাহিদা থাকে। ভালো দামও পাওয়া যায়।
সাপাহার উপজেলার তিলনা ইউনিয়নের চাচাহার গ্রামের আম চাষি ফিরোজ হোসেন বলেন, আম্রপালি আম খেতে সুস্বাদু হওয়ায় বাজারে এর চাহিদা বেশি থাকে। এছাড়াও দাম ভালো পাওয়া যায়। এজন্যই চাষিদের মাঝে আমরুপালি চাষের আগ্রহ বেশি থাকে। বর্তমানে আম্রপালি আমের দাম ভালো আছে। এ আম উৎপাদন, বিক্রি, ক্রেতার চাহিদা আর স্বাদ সবদিক মিলিয়ে অন্য কারো সঙ্গে তুলনা করা যায় না।
সাপাহার উপজেলার বরেন্দ্র অ্যাগ্রো পার্কের মাালিক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা বলেন, আমের নতুন বাণিজ্যিক রাজধানী নওগাঁ। এখানে সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদন হয় আম্রপালি। এই আম সারাদেশের মধ্যে গুণগতমান ভালো, অত্যন্ত সুস্বাদু ও সুমিষ্ট। এত সুন্দর আম্রপালি কোথাও পাওয়া যাবে না, সাপাহার উপজেলা ছাড়া। বিদেশেও এই আম ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছে। নওগাঁতে যেরকম গুণগতমান সম্পন্ন আম উৎপাদন করা হয়, এটা শুধু নওগাঁতেই সম্ভব।
তিনি বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা এখান থেকে আম্রপালি আম কিনে নিয়ে গিয়ে নিজেদের জেলার আম হিসেবে বাজারজাত করে। এটা বন্ধ করা উচিত। নওগাঁর আম্রপালি আমকে ব্রান্ডিং ঘোষণা করতে হবে। তাহলে কেউ নওগাঁর আমকে অন্য জেলার আম হিসেবে বাজারজাত করতে পারবে না। এজন্য স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের ভৃমিকা রাখান আহবান জানান এই তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা।
![]()
সাপাহারে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর থেকে আম কিনতে আসা শরিফুল ইসলাম বলেন, অনেক জায়গাতে আম্রপালি চাষ হলেও এখানকার আম খেতে খুবই সুস্বাদু। এজন্য রহনপুর থেকে এখানে এই আমটি কিনতে এসেছি। এখান থেকে আম কিনে ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, নোয়াখালী, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় পাঠাবো। এই আমটা যেখানেই যায়, সবাই নাম করে। এজন্য সাপাহারের আম্রপালি আমের চাহিদা বেশি।
ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে আম কিনতে আসা ইকবাল হোসেন বলেন, এ উপজেলার আম্রপালি অত্যন্ত সুস্বাদু ও সুমিষ্ট। এ আমের সারাদেশে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে সর্বোচ্চ ৩৫০০ টাকা মণ চলছে। এখান থেকে কিনে ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় সরবরাহ করা হয়।
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, এ অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ুর বিশেষত্বের কারণে দেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় নওগাঁর আম অনেক সুস্বাদু হয়। নওগাঁয় সবচেয়ে আম্রপালি বারি-৪, ব্যানানা ম্যাংগো বেশি চাষ হয়। সাপাহার ও পোরশা উপজেলার আম্রপালি সঙ্গে দেশের কোনো আম্রপালি আমের তুলনা হয় না। এর স্বাদ ও গুণগত মানের দিক থেকে যেকোনো আমের চেয়ে ভালো হওয়ার কারণে কৃষকরা আম্রপালি আম চাষে বেশি ঝুঁকছেন।
তিনি বলেন, এ অঞ্চলের আম্রপালি আম ব্র্যান্ডিং পর্যায়ে চলে যেতে পারে। আম্রপালি’কে জিআই পণ্য হিসেবে গণ্য করার জন্য দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি এটা নিয়ে কাজ করছে কৃষি বিভাগ বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
টিবি




