গাজীপুর সদর উপজেলার ভবানীপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে ডোবার পানিতে ব্রিফকেস ও প্লাস্টিকের বস্তায় খণ্ডিত ও অর্ধগলিত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতনামা নারীর পরিচয় শনাক্ত এবং হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পুলিশের দাবি, পরকীয়া-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে ওই নারীকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন নিহত ডলি আক্তারের পরকীয়া প্রেমিক মিশন ইসলাম (২২), তার মা বানু আক্তার (৪৩) ও মিশনের সহযোগী মিজানুর রহমান মিল্টন।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকালে জেলা পিবিআই কার্যালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান গাজীপুর ইউনিটের পুলিশ সুপার রকিবুল আক্তার।
পুলিশ জানায়, ডলি আক্তার জয়দেবপুর থানাধীন বানিয়ারচালা মেম্বারবাড়ী এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর তিনি একাই ওই বাসায় বসবাস করতেন।
মামলার বরাত দিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, গত ১১ সেপ্টেম্বর জয়দেবপুর থানাধীন ভবানীপুরের হামজা অ্যাপারেলসের উত্তর পাশে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম দিকে খালের পানিতে একটি ব্রিফকেস ও একটি প্লাস্টিকের বস্তা পাওয়া যায়। এর মধ্যে এক নারীর খণ্ডিত ও অর্ধগলিত মরদেহ ছিল। পিবিআই গাজীপুর জেলার ক্রাইমসিন টিম ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। পরে নিহতের পরিচয় শনাক্ত হলে তার বড় ভাই সোহেল (৪৪) বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে জয়দেবপুর থানায় মামলা করেন।
পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, মামলা হওয়ার পর পিবিআই ছায়া তদন্ত শুরু করে। একপর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মিজানুর রহমান মিল্টনকে গত শনিবার গ্রেফতার করা হয়। একই দিন ডলির পরকীয়া প্রেমিক মিশন ইসলাম ও তার মা বানু আক্তারকেও গ্রেফতার করা হয়।
আসামিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য এবং তাদের দেখানো মতে মিশন ইসলামের ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে মৃতদেহ খণ্ডিত করতে ব্যবহৃত একটি বটি দা, মৃতদেহ প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত স্কচটেপের অবশিষ্টাংশ, ডলি আক্তারের জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যবহৃত বাটন মোবাইল ফোন ও এক জোড়া জুতা উদ্ধার করা হয়।
পিবিআইয়ের তদন্তে জানা যায়, ডলি আক্তারের সঙ্গে মিশন ইসলামের প্রায় পাঁচ বছর ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তারা একই গার্মেন্টসে চাকরি করার সুবাদে পরস্পরের পরিচিত হন। ডলি প্রায়ই মিশনের ভাড়া বাসায় যাতায়াত করতেন।
তদন্তে পাওয়া তথ্য ও আসামিদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাত দিয়ে পিবিআই জানায়, গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে ডলি মিশনের ভাড়া বাসায় যান। সেখানে মিশন, তার মা বানু আক্তার ও ডলি একসঙ্গে রাতের খাবার খান। পরে বানু পাশের কক্ষে ঘুমাতে গেলে মিশন ও ডলি একই কক্ষে থাকেন।
মিশনের জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, আগের বিভিন্ন বিষয় ও বিয়ে নিয়ে বিরোধের কারণে তার মনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তিনি ডলিকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। ওই রাতে ডলিকে ঘুমের ওষুধ ও অ্যালার্জির ওষুধ খাওয়ানো হয়। পরে ডলি ঘুমিয়ে পড়লে মিশন লুঙ্গি দিয়ে তার গলায় পেঁচিয়ে এবং পরে বালিশ দিয়ে মুখ চেপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, হত্যার পর মরদেহটি চৌকির নিচে লুকিয়ে রাখা হয়। পরদিন সকালে বানু আক্তার ঘর পরিষ্কার করার সময় সেখানে ডলির মরদেহ দেখতে পান। পরে মরদেহ গুম করার উদ্দেশে মিশন একটি স্যুটকেস সংগ্রহ করেন। মরদেহ স্যুটকেসে না ধরায় বটি দা ও ব্লেড দিয়ে কোমর থেকে দ্বিখণ্ডিত করা হয়। মরদেহের একাংশ স্যুটকেসে এবং অপরাংশ পলিথিনে মুড়িয়ে প্লাস্টিকের বস্তায় রাখা হয়।
পরে মিশন তার বন্ধু মিজানুর রহমান মিল্টনকে বাসা পরিবর্তনের কথা বলে সহযোগিতার জন্য ডেকে আনেন। মিল্টন বাসায় এসে স্যুটকেস ও বস্তা অটোরিকশায় তুলতে সহযোগিতা করেন। এরপর মিশন, তার মা বানু আক্তার ও মিল্টন মিলে স্যুটকেস ও বস্তা অটোরিকশায় করে রাজেন্দ্রপুর এবং সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশায় ভবানীপুর এলাকায় যান। পরে ভবানীপুর ব্রিজ এলাকা থেকে মিশন ও মিল্টন স্যুটকেস ও বস্তাটি খালের পানিতে ফেলে দেন বলে পিবিআই জানিয়েছে।
প্রতিনিধি/এসএস




