রাজবাড়ী জেলা সদরের রামকান্তপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বারলাহুরিয়া গ্রামে দীর্ঘ ২০ বছরের পুরোনো একটি চলাচলের রাস্তা কেটে পুকুরে মিলিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় মো. কামরুজ্জামান নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ওই এলাকার কয়েকশ পরিবারের হাজারো মানুষ। রাস্তা না থাকায় বর্তমানে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে গ্রামটির স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। স্থানীয়রা বলছেন, রাস্তা কেটে ফেলায় কেউ মারা গেলে মরদেহ কাঁধে করে নিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা, সাধারণ মানুষের পায়ে হেঁটে চলার পথটুকুও আর অবশিষ্ট নেই।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বারলাহুরিয়া গ্রামের মৃত বজলুর রহমানের ছেলে অভিযুক্ত মো. কামরুজ্জামান সম্প্রতি ঘোষণা দেন তিনি রাস্তার জন্য নিজের কোনো জমি দেবেন না। এরপরই তিনি চলাচলের একমাত্র মাটির রাস্তাটির অর্ধেকেরও বেশি অংশ কেটে নিজের পুকুরের মধ্যে নামিয়ে দেন। ফলে রাস্তাটি সংকীর্ণ হয়ে পুকুরে বিলীন হয়ে গেছে।
খবর পেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও সরেজমিনে পরিদর্শন করতে মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ঘটনাস্থলে ছুটে যান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।
গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত দুই দশক ধরে এই রাস্তা দিয়েই এলাকার নারী, শিশু, শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ যাতায়াত করে আসছেন।
তিন চাকার ভ্যানে করে অসুস্থ রোগী হাসপাতালে নেওয়া কিংবা স্থানীয় খামারিদের মালামাল ও কৃষিপণ্য আনা-নেওয়া চলতো এই পথেই। এমনকি গ্রামটির একমাত্র কবরস্থানে যাতায়াতেরও পথ এটি। রাস্তাটি কেটে ফেলায় এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজেও স্থবিরতা নেমে এসেছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এই রাস্তা দিয়ে আমরা প্রায় ২০ বছর ধরে যাতায়াত করছি। হঠাৎ করে কামরুজ্জামান কারো কথা না শুনে রাস্তা কেটে পুকুরে ফেলে দিল। ’
তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের ঘরে কোনো মানুষ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নেওয়ার মতো পথ নেই। কদিন আগে একজন বয়স্ক লোক মারা গেছেন, তার লাশ কবরস্থানে নিতে যে কি কষ্ট হয়েছে তা বলে বোঝানো যাবে না।’
রাস্তা কাটার ফলে কৃষিপণ্য ও খামারের লোকসানের কথা জানান স্থানীয় খামারি সামাদ শেখ।
তিনি বলেন, ‘আমাদের খামারের ফিড আর মালামাল আনা-নেওয়ার একমাত্র পথ ছিল এটি। রাস্তা ভেঙে দেওয়ায় কোনো গাড়ি ঢুকতে পারছে না। সব মাথায় করে বয়ে নিয়ে আসতে হচ্ছে। এতে খরচ ও ভোগান্তি দুই-ই বেড়ে গেছে।’
একই গ্রামের গৃহিণী রহিমা বেগম ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা হেঁটে যেতে পারে না, যেকোনো সময় পুকুরে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। ’
তিনি আরও বলেন, ‘সামান্য একটু বৃষ্টি হলেই এই কাটা পথ দিয়ে পা পিছলে পুকুরে পড়ার উপক্রম হয়। আমরা দ্রুত এর স্থায়ী সমাধান চাই।’
অভিযুক্ত মো. কামরুজ্জামান বলেন, জমিটি তার ব্যক্তিগত মালিকানাধীন এবং তিনি নিজের জমিতে পুকুর কেটেছেন।
তবে সরকারি বা যৌথ ব্যবহারের পথ এভাবে ব্যক্তিস্বার্থে কেটে দেওয়া এবং জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনাটি জানতে পেরে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিরুপমা রায়। তিনি ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর বক্তব্য শোনেন এবং সরেজমিনে কাটা রাস্তা পরিদর্শন করেন।
ইউএনও বলেন, ‘জনগণের চলাচলের পথ বন্ধ করে বা ক্ষতিসাধন করে কোনো কাজ করা বরদাস্ত করা হবে না। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে চলাচলের পথ সুগম করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
রামকান্তপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. রাজিব বাবু বলেন, ‘বিষয়টি জানতে পেরেছি। বহু বছর ধরে সাধারণ মানুষ ও যানবাহন এই রাস্তা দিয়েই যাতায়াত করে আসছে। এভাবে হুট করে জনগণের চলাচলের পথ কেটে পুকুরে ফেলে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ’
তিনি বলেন, ‘এই ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন। বিষয়টি নিয়ে উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলে এবং প্রয়োজনে প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে দ্রুত চলাচলের পথটি চলাচলের উপযোগী করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে কাটা রাস্তাটি সংস্কার করে সাধারণ মানুষের চলাচলের উপযোগী করা হোক এবং জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারীর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
প্রতিনিধি/এএম




