দেশের বাজারে পাওয়া বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবারে উদ্বেগজনক মাত্রায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি পেয়েছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) একদল গবেষক। ৩২টি খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা করে বিশেষ করে সীসা (Pb) ও ক্রোমিয়ামের (Cr) উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য পেয়েছেন তারা। গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, ৩২টি পণ্যের মধ্যে ৩১টিতেই শিশুদের সম্ভাব্য অ-ক্যানসারজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ধারিত সীমার ওপরে।
যবিপ্রবির পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি এবং পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের গবেষকদের সঙ্গে এ গবেষণায় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব উলংগংয়ের গবেষকেরাও যুক্ত ছিলেন। গবেষণায় বেকারি পণ্য, স্ন্যাকস ও স্যাভরি পণ্য, চকলেট ও কনফেকশনারি, দুগ্ধজাত পণ্য এবং পানীয়—এই পাঁচ শ্রেণির ৩২টি পণ্য পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণার জন্য যশোরের বিভিন্ন খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ছয়টি ভারী ধাতু—সীসা, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, তামা ও নিকেল—পরীক্ষা করা হয়। কোনো নমুনায় ক্যাডমিয়াম ও আর্সেনিক পাওয়া যায়নি। তবে সীসা, ক্রোমিয়াম, তামা ও নিকেলের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

গবেষণায় সবচেয়ে বেশি সীসা ও ক্রোমিয়াম পাওয়া যায় একটি ক্রিম রোলের নমুনায়। এতে সীসার পরিমাণ ছিল ৩৫.৭০ মিলিগ্রাম/কেজি এবং ক্রোমিয়াম ৩৫.৩৯ মিলিগ্রাম/কেজি। বেকারি ও কনফেকশনারি পণ্যে সীসার নির্ধারিত সীমা ০.১ মিলিগ্রাম/কেজি ধরে এই মাত্রা প্রায় ৩৫৭ গুণ বেশি। ক্রোমিয়ামের সীমা ০.৫ মিলিগ্রাম/কেজি হওয়ায় এর মাত্রা প্রায় ৭১ গুণ বেশি।
একটি মিল্ক চকলেটের নমুনায় সীসা পাওয়া যায় ২৯.৪৯ মিলিগ্রাম/কেজি এবং ক্রোমিয়াম ২৬.৬৭ মিলিগ্রাম/কেজি। নির্ধারিত সীমার তুলনায় সেখানে সীসা প্রায় ২৯৫ গুণ এবং ক্রোমিয়াম প্রায় ৫৩ গুণ বেশি।

পানীয়ের নমুনাতেও উদ্বেগজনক মাত্রায় ভারী ধাতু পাওয়া গেছে। একটি কৃত্রিম আমের পানীয়তে ক্রোমিয়াম ১৩.৯৮, নিকেল ৩.০২, তামা ৮.৬৯ ও সীসা ১১.৮৮ মিলিগ্রাম/কেজি পাওয়া যায়। সফট ড্রিঙ্কে সীসার সীমা ০.০২ এবং ক্রোমিয়ামের সীমা ০.০৫ মিলিগ্রাম/কেজি ধরে ওই নমুনায় সীসা প্রায় ৫৯৪ গুণ এবং ক্রোমিয়াম প্রায় ২৮০ গুণ বেশি।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় শিশুদের ঝুঁকি বেশি। কারণ, একই পরিমাণ খাবার গ্রহণ করলেও কম শারীরিক ওজনের কারণে শিশুদের শরীরের ওজনের অনুপাতে ধাতু গ্রহণের মাত্রা বেশি হতে পারে। ৩২টি পণ্যের মধ্যে ৩১টিতে শিশুদের সম্মিলিত অ-ক্যানসারজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ধারিত সীমার ওপরে পাওয়া গেছে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এমন পণ্যের সংখ্যা ৯টি।
গবেষণাটির প্রধান লেখক ও গবেষক মো. সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, প্রক্রিয়াজাত খাবার কতটা নিরাপদ, সেই প্রশ্ন থেকেই গবেষণাটি শুরু করেন তারা। কয়েকটি খাবারে উদ্বেগজনক মাত্রায় ভারী ধাতু পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তৃতভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন তারা।

তিনি বলেন, “সরকারেরও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যাতে প্রক্রিয়াজাত খাবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো সম্ভব হয়।”
গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, মাটি, পানি ও বায়ু থেকে ভারী ধাতু খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে। উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় শিল্প-সরঞ্জাম, খাদ্য উপাদান বা প্যাকেজিং থেকেও দূষণ হতে পারে। তবে এই গবেষণায় কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কারখানাকে দূষণের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।

গবেষকেরা প্রক্রিয়াজাত খাবারে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও মান নিয়ন্ত্রণ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি আরও বেশি পণ্য ও নমুনা নিয়ে ভবিষ্যতে গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।
গবেষণাটি Journal of Food Composition and Analysis-এর ২০২৬ সালের ১৫৮তম খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাপত্রটি গত ২২ আগস্ট অনলাইনে প্রকাশিত হয়।
প্রতিনিধি/এসএস




