পবিত্র কোরআনের ৩০ পারা হিফজ করতে যেখানে অনেক শিক্ষার্থীর কয়েক বছর সময় লাগে, সেখানে মাত্র ১০ মাসে পুরো কোরআন মুখস্থ করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ১৪ বছরের কিশোরী তানজিলা আক্তার।
তার এই অসাধারণ সাফল্যে পটুয়াখালীর মহিপুর থানা সদরের বিপিনপুরের জিলাপিতলায় অবস্থিত জামিয়া হজরত ওমর (রা.) মাদরাসায় বইছে আনন্দের হাওয়া।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে তানজিলার এই অনন্য অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ মাদরাসার পক্ষ থেকে তাকে বিশেষ সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়। এসময় মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
তানজিলা আক্তার পটুয়াখালীর মহিপুর সদর ইউনিয়নের নিজামপুর গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা হাফেজ মো. সালাউদ্দিন হাওলাদার পেশায় একজন অটোচালক।
১০ মাস আগে জামিয়া হজরত ওমর ফারুক (রা.) মাদরাসার বালিকা শাখার হিফজখানায় ভর্তি হয় তানজিলা। এরপর নিয়মিত অধ্যবসায়, একাগ্রতা ও শিক্ষিকাদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে মাত্র ১০ মাসেই পবিত্র কোরআনের ৩০ পারা হিফজ সম্পন্ন করে।
সম্মাননা পেয়ে উচ্ছ্বসিত হাফেজা তানজিলা আক্তার বলে, ‘আমি জামিয়া হজরত ওমর ফারুক (রা.) মাদরাসা থেকে হিফজ সম্পন্ন করেছি। এখানকার শিক্ষিকারা অত্যন্ত সুন্দরভাবে ও যতেœর সঙ্গে পাঠদান করেন। যখনই কোনো জায়গা কঠিন লাগত, তারা সহজ করে বুঝিয়ে দিতেন। অল্প সময়ে কোরআন হিফজ করতে পেরে আমি খুবই খুশি। ভবিষ্যতেও নিয়মিত কোরআন পড়তে চাই এবং কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে চাই।’
একমাত্র মেয়ের এমন গৌরবময় অর্জনে আবেগাপ্লুত তানজিলার বাবা হাফেজ মো. সালাউদ্দিন হাওলাদার বলেন, ‘মেয়ের ছোটবেলা থেকেই কোরআনের প্রতি আগ্রহ ছিল। হিফজের সময় সে অনেক পরিশ্রম করেছে। কখনো কখনো ক্লান্ত হলেও পড়া বন্ধ করেনি। তার এই অর্জন আমাদের পরিবারের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। আমরা আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি এবং মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কমিটির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’
মাদরাসার বালিকা হিফজ শাখার শিক্ষিকা হাফেজা মোসা. মারজিয়া আক্তার বলেন, ‘তানজিলা অত্যন্ত মেধাবী ও মনোযোগী শিক্ষার্থী। নতুন সবক মুখস্থ করার পাশাপাশি পুরনো পড়া ধরে রাখার ক্ষেত্রেও তার আন্তরিকতা ছিল। অনেক সময় দেখা যেত, অন্যরা যখন বিশ্রাম নিচ্ছে, তখনও তানজিলা কোরআন মাজিদ নিয়ে মগ্ন। নিয়মিত অনুশীলন ও আমাদের নির্দেশনা সঠিকভাবে মেনে চলার কারণেই অল্প সময়ে সে হিফজ সম্পন্ন করতে পেরেছে। মাত্র ১০ মাসে হিফজ শেষ করা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। এটি মহান আল্লাহর রহমত ও তানজিলার কঠোর পরিশ্রমের ফল।’
স্থানীয় আলেম ও ব্যবসায়ী হাফেজ মো. মতিন বলেন, ‘কোরআন হিফজ করা অত্যন্ত মর্যাদার বিষয়। তবে শুধু কোরআন মুখস্থ করাই শেষ কথা নয়; এর অর্থ ও শিক্ষা অনুধাবন করে সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করাই প্রকৃত সাফল্য। তানজিলার জন্য আমাদের দোয়া ও শুভকামনা রইল।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এমন একটি মাদরাসা রয়েছে, যেখান থেকে মাত্র ১০ মাসে একজন মেয়ে হাফেজা হয়েছে। এর আগে একই মাদরাসার বালক শাখা থেকে মাত্র আট মাসে একজন ছাত্র কোরআন হিফজ সম্পন্ন করেছে। এটি নিঃসন্দেহে পুরো মহিপুরবাসীর জন্য গর্বের।’
জামিয়া হযরত ওমর (রা.) মাদরাসার মুহতামিম মুফতি আবুল কালাম আজাদী বলেন, ‘একজন ছাত্রীর জন্য কোরআনুল কারিমের ৩০ পারা মুখস্থ করা নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। মাত্র ১০ মাসে হিফজ সম্পন্ন করে তানজিলা প্রমাণ করেছে, সদিচ্ছা, কঠোর পরিশ্রম ও সঠিক পরিবেশ থাকলে অনেক কিছুই সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের মাদরাসা শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার মানোন্নয়নের পাশাপাশি তাদের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক উন্নয়নের দিকেও গুরুত্ব দেয়। তানজিলার এই সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদেরও গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করবে। আমরা তার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য দোয়া করি।’
দোয়া ও সম্মাননা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মাদরাসার উপদেষ্টা হাফেজ আব্দুল বারেক, প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল খালেক কবিরাজ, ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. মোস্তফা সরদার, সিনিয়র সহসভাপতি কিরণ হাওলাদার, সহসভাপতি মোশাররফ মুসুল্লি, নাজিমে তালিমাত হাফেজ মো. হারুন হাওলাদারসহ শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি।
অনুষ্ঠান শেষে হাফেজা তানজিলার দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য, উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এবং মাদরাসার উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
উল্লেখ্য, এর আগে গত মে মাসের শেষদিকে একই মাদরাসার বালক শাখার হিফজখানার শিক্ষার্থী মেজবাহ উদ্দিন মুয়াজ মাত্র আট মাসে কোরআনের ৩০ পারা হিফজ সম্পন্ন করে আলোচনায় আসে।
প্রতিনিধি/এএইচ



