সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

জঙ্গলে পরিণত হয়েছে ৭ বছর ধরে বন্ধ কসবার তারাপুর বর্ডার হাট

আশিকুর রহমান মিঠু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৮ পিএম

শেয়ার করুন:

জঙ্গলে পরিণত হয়েছে ৭ বছর ধরে বন্ধ কসবার তারাপুর বর্ডার হাট
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার তারাপুর ও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কমলাসাগর এলাকার মধ্যকার বর্ডার হাটটি এখন জঙ্গলে পরিণত হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার তারাপুর ও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কমলাসাগর এলাকার মধ্যকার বর্ডার হাটটি এখন জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। প্রায় সাত বছর ধরে বন্ধ রয়েছে হাটটি। সম্প্রতি হাটটির বর্তমান অবস্থা জানতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

২০১৫ সালের ৭ জুন বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তারাপুর-কমলাসাগর বর্ডার হাটের উদ্বোধন করেন। এরপর করোনা মহামারির কারণে ২০১৯ সালে হাটটি বন্ধ হয়ে যায়। ২০২৪ সালের আগস্টের প্রথম দিকে এটি পুনরায় চালুর কথা থাকলেও সরকার পতনের কারণে তা আর হয়নি।

কসবা স্টেশন থেকে কিছুটা এগোলেই হাটে যাওয়ার পথে বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড দেওয়া দেখা যায়। পাশে ঝুলছে ‘ভিতরে প্রবেশ নিষেধ’ লেখা নোটিশ। নিচে লেখা—‘আদেশক্রমে বিজিবি’। এর প্রায় দেড় থেকে দুই শ গজ দূরে বাংলাদেশ সীমান্তের আরেকটি সাইনবোর্ড। লাল রঙের ওই সাইনবোর্ডে লেখা, ‘বাংলাদেশের শেষ সীমানা, প্রবেশ নিষেধ।’

তবে এসব নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই নির্জন ও পরিত্যক্ত হাটটির দিকে কয়েকজন নারী ও তরুণকে যেতে দেখা যায়। উত্তর-দক্ষিণমুখী রাস্তা থেকে কিছুটা উঁচুতে উঠলেই ভারতের কাঁটাতারের বেড়ার পাশ দিয়ে হাটে যাওয়ার পাকা রাস্তা। পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে চলে যাওয়া রাস্তাটি গিয়ে শেষ হয়েছে ২০৩৯ নম্বর সীমান্ত পিলারের কাছে। হাতের বাঁ দিকে হাটে প্রবেশের ফটক। তাতে ঝুলছে তালা।

85b7dc95-ed23-4572-abea-ca51eb01b721

হাটটিতে বাংলাদেশ ও ভারতের অংশে ছয়টি করে মোট ১২টি শেড রয়েছে। রয়েছে গণশৌচাগার ও কনফারেন্স কক্ষ। দুই পাশে সীমানাপ্রাচীর ও প্রবেশফটকও রয়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় এসব স্থাপনার চারপাশে গজিয়েছে আগাছা ও ঝোপঝাড়।

শুরুতে দুই দেশের ২৫ জন করে মোট ৫০ জন ব্যবসায়ী এই হাটে দোকান খুলেছিলেন। পরে আরও ২৫ জন করে ব্যবসায়ী বাড়িয়ে সংখ্যা ১০০ করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই হাটটি দুই দেশের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। এপারের ও ওপারের আত্মীয়স্বজনদের দেখা-সাক্ষাতের সুযোগ তৈরি হয়। ক্রমেই হাট ঘিরে বাড়তে থাকে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের আগ্রহ।

কসবা উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, শুরুতে সীমান্ত হাটের দিনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ১ হাজার ক্রেতা কার্ড ইস্যুর প্রস্তাব ছিল। কিন্তু দুই দেশের বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থী ও ক্রেতার সমাগম হওয়ায় পরে বাংলাদেশ থেকে ৩ থেকে ৪ হাজার ক্রেতা কার্ডের আবেদন করা হয়। পরে কার্ডের সংখ্যা বাড়িয়ে ২ হাজার করা হয়।

আরও পড়ুন

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্তজুড়ে মাদকের সাম্রাজ্য, ৩ উপজেলা ঘিরে পাচারের জাল

হাটে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা মেলামাইন, খাদি কাপড়, বিস্কুট ও বেকারি সামগ্রী, শাকসবজি, ফল ও ফলের জুস, প্লাস্টিক সামগ্রী, লুঙ্গি-গামছাসহ গার্মেন্টসপণ্য, অ্যালুমিনিয়াম ও ক্রোকারিজ সামগ্রী, স্থানীয় তুলা, গৃহস্থালির সামগ্রী, প্রসাধনসামগ্রী ও শুঁটকি বিক্রি করতেন। রোববার সীমান্ত হাটের দিন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা প্রায় ২০ লাখ টাকার সমমূল্যের পণ্য বিক্রি করতেন বলে জানা গেছে।

হাটটি চালু থাকাকালে সীমান্তে চোরাচালান কমে গিয়েছিল বলে জানান বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা। তাদের ব্যবসাও ভালো চলত। হাট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পাশাপাশি হাটকেন্দ্রিক স্থানীয় মানুষেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

a951c557-f0c5-4f8b-ae70-23bc525cadeb

কসবার জলখাবার মিষ্টির দোকানের মালিক সেবক সাহা বর্ডার হাটে একটি মিষ্টির দোকান চালাতেন। তিনি বলেন, ‘হাট যখন ছিল, তখন আমাদের এখানে চোরাকারবারি কম হতো। বর্ডার হাটে যে জিনিস পাওয়া যেত, সেটি চোরাইভাবে নামত না। এখানকার মানুষ হাট থেকে ফল, কলা ইত্যাদি সস্তায় কিনে এনে বিক্রি করে লাভবান হতো।’

তিনি আরও বলেন, ‘হাটটি ছিল দুই দেশের মানুষের মিলনমেলা। আমাদের দেশের অনেক দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসত। আবার ওপার থেকেও মানুষ আসত। আমার দোকানের পেছনে বসে অনেক মানুষ কথা বলত, দই-মিষ্টি খেত। অন্য রকম একটা ফিলিংস ছিল।’

তারাপুর গ্রামের গৃহিণী লুৎফা বেগম স্বামীর পাশাপাশি হাটে নিজেও একটি দোকান চালাতেন। তাদের ক্রোকারিজ ও কাপড়ের ব্যবসা ছিল। তিনি বলেন, ‘ব্যবসা থেকে ভালো টাকা আসত।’

খারপার গ্রামের মো. মালু মিয়া হাটে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি বলেন, ‘এটি গুরুত্বপূর্ণ হাট ছিল। এখন পরিত্যক্ত। এখানে দুই দেশের অনেক মানুষ আসত। এটি চালু থাকা অবস্থায় চোরাকারবার হতো না। চুরি, মাদকও ছিল না। মাসে চারটা বাজার বসত। অনেক ভালো ছিলাম। হাটটি চালু করলে আমরা উপকৃত হব।’

তিনি জানান, বাংলাদেশি মানুষের ভারতীয় পণ্যের প্রতি আগ্রহ বেশি থাকায় বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের তুলনায় ভারতীয় দোকানিদের বিক্রি বেশি হতো।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে গত জুনের শেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের কাছে বর্ডার হাটের বিষয়ে খোঁজখবর জানতে চিঠি দেওয়া হয়। এরপর জুলাইয়ে জেলা প্রশাসন থেকে কসবা উপজেলা প্রশাসনকে চিঠি পাঠিয়ে হাটটির বর্তমান পরিস্থিতি ও কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।

কসবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ছামিউল ইসলাম বলেন, ‘ডিসি অফিস থেকে হাটের সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। এরপর সহকারী কমিশনার (ভূমি) সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। হাটটি এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি চালু হলে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি দুই দেশের মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি হবে। কসবার অনেক বাসিন্দার আত্মীয়স্বজন ওপারে রয়েছেন। তাদের মধ্যেও পারিবারিক যোগাযোগ বাড়বে। এ বিষয়ে নতুন কোনো চিঠি পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর