জরাজীর্ণ রেলপথ, পুরোনো ইঞ্জিন ও নিয়মিত যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ময়মনসিংহ অঞ্চলের রেলযাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। গত তিন মাসে এই রুটে অন্তত পাঁচটি ট্রেন লাইনচ্যুত এবং ২২টি ইঞ্জিন বিকল ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ট্রেন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় দুর্ভোগে পড়ছেন যাত্রীরা।
ঢাকা-ময়মনসিংহ-জামালপুর, মোহনগঞ্জ, জারিয়া, কিশোরগঞ্জ ও চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী রেলপথের বিভিন্ন অংশ দীর্ঘদিনের পুরোনো। রেলওয়ে সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, এসব পথে ট্র্যাকের বিভিন্ন উপকরণ ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ায় এবং প্রয়োজনের তুলনায় ইঞ্জিন কম থাকায় নিয়মিত ট্রেন চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। কোনো ট্রেন লাইনচ্যুত বা ইঞ্জিন বিকল হলে অন্য ট্রেনের চলাচলও ব্যাহত হয়।
সর্বশেষ গত শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে জামালপুর থেকে ঢাকাগামী তিস্তা এক্সপ্রেস ময়মনসিংহ নগরের নতুন বাজার এলাকায় পৌঁছালে ইঞ্জিনের ত্রুটির কারণে থেমে যায়। এতে ঢাকা-জামালপুর পথে প্রায় আধাঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। পরে বিকল্প ইঞ্জিনের সাহায্যে ট্রেনটি স্টেশনে নেওয়ার পর রেলপথ সচল হয়।
এর আগে ২২ আগস্ট ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে সোয়া দুই ঘণ্টা আটকে থাকে। ১৫ আগস্ট একই এলাকায় অগ্নিবীণা এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল হয়। ৭ আগস্ট গফরগাঁও স্টেশনের কাছে জামালপুর কমিউটার ট্রেনের পাঁচটি বগি লাইনচ্যুত হলে ঢাকার সঙ্গে প্রায় সাত ঘণ্টা রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকে।

এ ছাড়া ১৬ জুলাই তিন ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। ১০ জুন ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেসের পাওয়ার কার ও একটি উদ্ধারকারী ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনাও ঘটে।
ময়মনসিংহ রেলওয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মে মাসে আটটি, এপ্রিলে ছয়টি এবং জুনে তিনটি ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়েছে। এ ছাড়া ১৫ জুন গফরগাঁওয়ে জামালপুর এক্সপ্রেসের বগি থেকে ইঞ্জিন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একই দিন আঠারোবাড়িতে বিজয় এক্সপ্রেসের ইঞ্জিনে আগুন লাগে।
ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথের বিভিন্ন স্থানে স্লিপারের ফাস্টেনিং ক্লিপ ভাঙা বা গায়েব হয়ে গেছে। ক্ষয়প্রাপ্ত স্লিপার, দুর্বল বেস প্লেট ও পর্যাপ্ত পাথর (ব্যালাস্ট) না থাকায় ট্র্যাকের স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এই রুটে বর্তমানে ১৮ জোড়া ট্রেন চলাচল করলেও ইঞ্জিন ও কোচ সংকটের কারণে কয়েকটি মেইল ও লোকাল ট্রেন বন্ধ রয়েছে। অরক্ষিত রেলক্রসিং ও সিগন্যালিং ব্যবস্থার দুর্বলতাও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, ট্রেন দুর্ঘটনা বা লাইনচ্যুতির পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। তাদের দাবি, দ্রুত জরাজীর্ণ রেলপথ সংস্কার, ক্ষতিগ্রস্ত স্লিপার ও অন্যান্য উপকরণ পরিবর্তন এবং নতুন ইঞ্জিন সংযোজন করা প্রয়োজন।

ময়মনসিংহ স্টেশনের লোকোশেড পরিদর্শক শফিউল হাসান বলেন, অধিকাংশ ইঞ্জিন অনেক পুরোনো। পূর্ণাঙ্গ মেরামত ছাড়াই বাধ্য হয়ে এগুলো ট্রিপে পাঠাতে হচ্ছে। এ কারণে ইঞ্জিনগুলো বারবার বিকল হচ্ছে।
রেলওয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসান বলেন, এই রুটের অধিকাংশ ইঞ্জিন মেয়াদোত্তীর্ণ। নতুন ইঞ্জিন সংযোজনের পাশাপাশি শ্রীপুর থেকে ময়মনসিংহ হয়ে বিদ্যাগঞ্জ, গৌরীপুর, আঠারোবাড়ি, মোহনগঞ্জ ও জারিয়া পর্যন্ত রেলপথ দ্রুত সংস্কার করা জরুরি। বিশেষ করে পাথরের ঘাটতি মেটানো না গেলে দুর্ঘটনা রোধ করা কঠিন হবে।
প্রতিনিধি/এসএস





