মাগুরায় বহুল আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় প্রধান আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন আছিয়ার মা আয়েশা আক্তার। একই সঙ্গে দ্রুত রায় কার্যকর এবং নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (৩১ আগস্ট) হাইকোর্টের বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার বেঞ্চ মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায় ঘোষণা করেন। রায়ে হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। তবে মামলার অপর তিন আসামির খালাসের বিরুদ্ধে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
রায় ঘোষণার পর স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আয়েশা আক্তার বলেন, ‘আজকে ফাঁসির রায় ঘোষণা করেছে। যতক্ষণ পর্যন্ত হিটু শেখের ফাঁসি কার্যকর না হবে, ততক্ষণ আমার মনে কোনো শান্তি নেই। যখন হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে শুনতে পাব, তখন আমি খুশি হব এবং গোটা এলাকাবাসীও খুশি হবে।’
আছিয়ার মা বলেন, ‘আমার মনি (আছিয়া) কোনো অপরাধ করেনি। যে কষ্ট নিয়ে দুনিয়া থেকে চলে গেছে, সেই কষ্ট কোনো মা যেন না পায়। আমার মনিকে বাঁচানোর জন্য সরকার অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু ওর বাঁচার ক্ষমতা ছিল না।’
হিটু শেখের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে আছিয়ার মা বলেন, ‘এমনভাবে হিটুর ফাঁসি দেওয়া হোক, যাতে গোটা পৃথিবীর মানুষ বুঝতে পারে যে সরকার এখনো বিচার করতে পারে।’
দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি চাই দ্রুত রায় কার্যকর করা হোক। আমার পরিবার অসহায়। সরকারের কাছে আমার চাওয়া, আমার পরিবারকে সহযোগিতা করা হোক।’
এ সময় নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেন আয়েশা আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমি তো আতঙ্কের মধ্যে রয়েছি। ফাঁসির রায় আবার ঘোষণা করা হয়েছে। হিটু শেখের ছেলেরা যদি আবার আমার পরিবারের ক্ষতি করে—এজন্য সরকারের সহযোগিতা চাই। প্রশাসন যাতে তাদের নজরে রাখে, যাতে আমার পরিবারের কোনো ক্ষতি করতে না পারে।’
তিনি জানান, তার আরও ১১ বছরের একটি সন্তান রয়েছে, যে স্কুলে যায়। এ কারণে পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৫ মার্চ রাতে রমজানের ছুটিতে শহরের নিজনান্দুয়ালী এলাকায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণের শিকার হয়। মামলায় অভিযোগ করা হয়, তার বোনের শ্বশুর হিটু শেখ শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যার চেষ্টা করেন।
গুরুতর আহত অবস্থায় আছিয়াকে প্রথমে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ মার্চ তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় আছিয়ার মা আয়েশা আক্তার বাদী হয়ে হিটু শেখসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে পুলিশ মামলার সব আসামিকে গ্রেফতার করে।
২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল পুলিশ মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করে। একই বছরের ২৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়। ২৭ এপ্রিল থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়ে রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়। ৭ মে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। মাত্র ১৩ কার্যদিবসে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়।
পরে ১৩ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। ১৭ মে আদালত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে প্রধান আসামি হিটু শেখকে (৪৭) মৃত্যুদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। অপর তিন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।
বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর আইন অনুযায়ী মামলার নথি অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টে পাঠানো হয়। গত বছরের ২১ মে মামলার নথি উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে পেপারবুক প্রস্তুতসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে মামলাটি হাইকোর্টের বিশেষায়িত বেঞ্চে শুনানির জন্য ওঠে।
গত ২৪ আগস্ট হিটু শেখের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শেষ হয়। পরে ২৫ আগস্ট রায় ঘোষণার দিন পিছিয়ে ৩১ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়। সোমবার সেই রায় ঘোষণা করে হাইকোর্ট হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন।
প্রতিনিধি/জেবি




