মাগুরার শিশু আছিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখলেও বিচারিক প্রক্রিয়া ও আসামির আইনি সহায়তার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাইকোর্ট।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, আসামিপক্ষের আইনজীবী তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারেননি। একজন দক্ষ আইনজীবী হলে আসামি হয়তো আইনি কোনো সুবিধা পেতে পারতেন।
এর আগে সকালে মাগুরার আট বছরের শিশু আছিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে আলোচিত এ মামলার রায়ে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আদালত বলেছেন, কোনো বিশেষ ন্যারেটিভ বা সামাজিক চাপ যেন বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত না করে, সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। দ্রুত বিচারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও ‘জাস্টিস হারিড, জাস্টিস বারিড’ প্রবাদের উল্লেখ করে তাড়াহুড়ো না করে আইনি বিধান মেনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বিষয়েও সতর্ক করেছেন উচ্চ আদালত।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
এর মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত এ মামলায় বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডই উচ্চ আদালতে বহাল থাকল।
অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, আদালত বেশ কয়েকটি পর্যবেক্ষণের মধ্যে উল্লেখ করেছেন, আসামিপক্ষের আইনজীবী তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারেননি। আদালত মন্তব্য করেছেন, সাক্ষীদের জেরা করার ক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ আইনজীবী থাকলে আসামিপক্ষ হয়তো কিছু আইনি সুবিধা পেতে পারত। এমন ক্ষেত্রে আসামিকে যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন—এমন একজন সিনিয়র ও অভিজ্ঞ আইনজীবীকেও আদালত নিয়োগ দিতে পারতেন।
তবে এটি আদালতের একটি পার্শ্ব মন্তব্য এবং মামলার রায়ের সঙ্গে এর কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে গত ১৩ আগস্ট আসামিপক্ষের পূর্ববর্তী আইনজীবী উপস্থিত না হওয়ায় এবং অনাপত্তি সনদ (এনওসি) দেওয়ায় আদালত সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাফিজুর রহমান খানকে আসামির পক্ষে মামলা লড়ার জন্য স্টেট ডিফেন্স হিসেবে নিয়োগ দেন। গত ১১ আগস্ট থেকে এ বেঞ্চে মামলাটির ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শুরু হয়েছিল।
মিডিয়া ট্রায়াল নিয়ে সতর্কতা
রায়ে আদালত ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
অ্যাটর্নি জেনারেলের ভাষায়, মিডিয়ায় প্রকৃত তথ্যের বাইরে অনেকে অপতথ্য ছড়ান কিংবা সামাজিক চাপ ও এক ধরনের ন্যারেটিভ তৈরি হয়, যা বিচারকাজকে প্রভাবিত করতে পারে। আদালত সতর্ক থাকতে বলেছেন, যেন কোনো ব্যক্তি আইন-আদালতের ঊর্ধ্বে গিয়ে মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার না হন।
এ ছাড়া দ্রুত বিচারের বিষয়ে ‘জাস্টিস হারিড, জাস্টিস বারিড’ শব্দগুচ্ছ উল্লেখ করে আদালত বলেছেন, বিচার সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে যেন কোনো তাড়াহুড়ো না করা হয় এবং আসামির ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার ও আইনের বিধান যথাযথভাবে মানা হয়।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৬ মার্চ মাগুরায় আট বছরের শিশু আছিয়া তার বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে বোনের শ্বশুর হিটু শেখের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়। ঘটনার পর ১৩ মার্চ ঢাকা সিএমএইচে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছিয়ার মৃত্যু হয়।
কাজল জানান, আদালত হিটু শেখের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। জবানবন্দিতে হিটু শেখ স্বীকার করেছেন, তিনি শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে পাশের ঘর থেকে ব্লেড এনে তার যৌনাঙ্গ কেটেছেন এবং পরে ওড়না দিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে অচেতন করেছেন। আসামির পরিহিত লুঙ্গিতে পাওয়া বীর্যের ডিএনএ পরীক্ষাতেও অপরাধের প্রমাণ মিলেছে।
আদালত এই জবানবন্দিকে ‘ট্রু অ্যান্ড ভলান্টারি’ বা সত্য ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আসামি গ্রেপ্তারের পর দোষ স্বীকার করে ক্ষমাও চেয়েছিলেন।
২০২০ সালের ১৭ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ওই মামলায় আরও তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল—আছিয়ার দুলাভাই সজীব, দুলাভাইয়ের ভাই রাতুল শেখ এবং মা জাহিদা। তবে ট্রাইব্যুনাল তাদের সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় খালাস দেন। রাষ্ট্রপক্ষ বা বাদীপক্ষ এই খালাসের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় তাদের খালাসের আদেশ বহাল রয়েছে।
অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, বিচারিক প্রক্রিয়া স্বাভাবিক গতিতেই চলছে। আলোচিত রামিসা হত্যা মামলাটিও এ আদালতের তালিকায় রয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে সেটিরও বিচার হবে।
তিনি বলেন, দ্রুত বিচারপ্রাপ্তি যেমন ভুক্তভোগীর অধিকার, তেমনি ন্যায়বিচার পাওয়া আসামিরও সাংবিধানিক অধিকার। আদালত এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কথা বলেছেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ ইমাম হোসেন তারেক ও সৈয়দ ইজাজ কবির। অন্যদিকে আসামিপক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্র নিযুক্ত (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবী হাফিজুর রহমান খান।
২০১৯ সালের ৫ মার্চ রাতে মাগুরা শহরের নিজনান্দুয়ালী এলাকায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয় শিশু আছিয়া। বোনের শ্বশুর হিটু শেখ তাকে ধর্ষণের পর হত্যার চেষ্টা চালান। গুরুতর আহত অবস্থায় আছিয়াকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটির মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় আছিয়ার মা বাদী হয়ে হিটু শেখসহ চারজনকে আসামি করে মামলা করেন। পুলিশ দ্রুত তদন্ত শেষে একই বছরের ১৩ এপ্রিল অভিযোগপত্র দাখিল করে। ২৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়।
মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মাত্র ১৩ কার্যদিবসে বিচারিক কার্যক্রম শেষ করে ২০১৯ সালের ১৭ মে রায় ঘোষণা করেন। রায়ে প্রধান আসামি হিটু শেখকে (৪৭) মৃত্যুদণ্ড এবং এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। অপরাধে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় মামলার অন্য তিন আসামি—হিটু শেখের ছেলে সজীব শেখ, ছোট ছেলে এবং স্ত্রী জাহেদা বেগমকে খালাস দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার যাবতীয় নথি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে জেলখানা থেকে আপিল করেন দণ্ডিত আসামি। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে পেপারবুক প্রস্তুত হওয়ার পর হাইকোর্ট আজ মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখলেন।
আরএনবি/এআর




