রোববার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

যে স্কুলে ৩৮ বছর কাটালেন, সেখানেই লাশ হয়ে ফিরলেন রনজিলা

জেলা প্রতিনিধি, বগুড়া
প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম

শেয়ার করুন:

যে স্কুলে ৩৮ বছর কাটালেন, সেখানেই লাশ হয়ে ফিরলেন রনজিলা
রনজিলা পারভীনের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স। ছবি: ঢাকা মেইল

প্রতিদিন সকালে তাড়াহুড়ো করে বাসা থেকে বের হতেন রনজিলা পারভীন। গন্তব্য ছিল গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। স্কুলে পৌঁছেই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ঘিরে ধরতেন। কে পড়া শিখেছে, কে স্কুলে আসেনি, কার বাড়িতে কী সমস্যা- সবকিছুর খোঁজ রাখতেন তিনি।

কিন্তু রোববার সকালে সেই পরিচিত দৃশ্য আর দেখা গেল না। স্কুলে এলেন রনজিলা পারভীন। তবে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে নয়, এলো সাদা লাশবাহী ফ্রিজিংভ্যানে তার নিথর দেহ।

রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে চলন্ত রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে প্রাণ হারানো রনজিলা পারভীন (৫৭) বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। দীর্ঘ ৩৮ বছরের শিক্ষকতা জীবনের বড় একটি সময় তিনি কাটিয়েছেন এই বিদ্যালয়ে।

রোববার বেলা ১১টার দিকে তার মরদেহ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পৌঁছালে প্রিয় শিক্ষিকাকে শেষবার দেখতে ছুটে আসেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সহকর্মী ও এলাকাবাসী। কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো বিদ্যালয় চত্বর।

প্রিয় শিক্ষিকাকে হারিয়ে ভেঙে পড়ে বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিয়া আক্তার।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে বলে, আমাদের ম্যাডাম অনেক ভালো একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি আমাদের খুব ভালোবাসতেন, খবর নিতেন। আমরা কেউ বিদ্যালয়ে না এলেও তিনি বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিতেন। বৃত্তির জন্য আমাদের অনেক কষ্ট করেছেন। খুব ভালো পড়াশোনা করাতেন। ম্যাডাম আর আমাদের মাঝে নেই।

নিহতের স্বজনরা জানান, গত শুক্রবার রাত ১২টার বাসে স্বামী আব্দুল মতিনের সঙ্গে চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন রনজিলা পারভীন। শনিবার ভোরে রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে পৌঁছান তারা। সেখান থেকে ফার্মগেটের ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে যাওয়ার জন্য রিকশায় ওঠেন রনজিলা ও তার স্বামী।

ভোর সাড়ে ৬টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে তাদের রিকশা পৌঁছালে মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী রনজিলার হাতে থাকা ব্যাগ ধরে টান দেয়। একপর্যায়ে চলন্ত রিকশা থেকে পাকা সড়কে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। 

স্বামী আব্দুল মতিন বলেন, আমরা রিকশায় করে ফার্মগেটের দিকে যাচ্ছিলাম। খামারবাড়ি পৌঁছানোর আগেই মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী তার হাতব্যাগ হ্যাঁচকা দিয়ে টান দিয়ে নিয়ে যায়। ওই সময় ভারসাম্য রাখতে না পেরে রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে যায় সে।

তিনি বলেন, চিকিৎসা করাতে গিয়েছিলাম, লাশ হয়ে ফিরতে হলো। এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।

নিহতের বড় ভাই জাহিদুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

১৯৮৮ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন রনজিলা পারভীন। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন।

গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের পোশাকসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা করতেন। কোনো শিক্ষার্থী স্কুলে না এলে বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিতেন। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি হবে- এই চিন্তায় সহজে ছুটিও নিতে চাইতেন না।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মেরিনা খাতুন বলেন, কোমলমতিদের পড়াশোনার ক্ষতি হবে ভেবে তিনি সহজে ছুটি নিতে চাইতেন না। স্কুল ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে তার সব সময় চিন্তা ছিল।

গাবতলী উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষক হিসেবে রনজিলা পারভীন ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও নিবেদিতপ্রাণ। তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। 

তিনি বলেন,৩৮ বছর যে বিদ্যালয়ে শিশুদের পড়িয়েছেন, ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছেন, সেই বিদ্যালয়েই শেষবার ফিরলেন রনজিলা পারভীন। তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন শিক্ষার্থীরা, কিন্তু তিনি ফিরলেন না ক্লাস নিতে। ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে।

রোববার বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে রনজিলা পারভীনের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে শ্বশুরবাড়ি দারাইল এলাকায় দ্বিতীয় জানাজা শেষে তরফসরতাজ পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

প্রতিনিধি/এলএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর