ফল প্রকাশের পর চারদিকে যখন আনন্দের আমেজ, তখন সাঈদের ঘরে নীরবতা। ভালো ফল করেও হাসি নেই তার পরিবারের মুখে। নেই মিষ্টি বিতরণ কিংবা আনন্দ-উচ্ছ্বাস। বরং সামনে বড় দুশ্চিন্তা। মেধাবী আবু সাঈদ খুদুরীর উচ্চশিক্ষার খরচ জোগাবে কে? অর্থের অভাবে থমকে যাবে কি তার স্বপ্ন? এমন নানা প্রশ্নের মুখোমুখি সাঈদের পরিবার।
এই মেধাবী শিক্ষার্থীর বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের দেওডোবা গ্রামে। তার পিতা রাশিদুল ইসলাম একজন ভ্যানচালক। মা শিউলি বেগম একজন গৃহিনী। তবুও উপজেলার ফলগাছা রুহুল উলুম দাখিল মাদ্রাসা থেকে এ বছরে দাখিল পরীক্ষা (এসএসসি) দিয়ে ১২৫০ নম্বর পেয়ে সে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছে।
দারিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়ায় অভাব-অনটন ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়েই পড়াশোনা চালিয়ে এসেছে সাঈদ। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও পড়াশোনায় ছিল তার প্রবল আগ্রহ। কঠোর পরিশ্রমের ফলও পেয়েছে সে। কিন্তু ফলাফলের আনন্দকে ছাপিয়ে গেছে উচ্চশিক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তা।
সাঈদের পরিবারের সদস্যরা জানান, সংসারের নিত্যদিনের খরচ চালাতেই তাদের হিমশিম খেতে হয়। সেখানে সন্তানের ভর্তি, বই-খাতা, থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য শিক্ষাব্যয় বহন করা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব। ফলে ভালো ফল করার পরও সাঈদের স্বপ্ন যেন থমকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সাঈদের চোখে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক স্বপ্ন। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠিত হতে চায় সে। পরিবারের দারিদ্র্য যেন তার সেই স্বপ্নের পথে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ না পেলে এতদিনের পরিশ্রম ও অর্জনও ম্লান হয়ে যেতে পারে— এমন আশঙ্কা পরিবারের।
আবু সাঈদ খুদুরী বলে, ‘পড়াশোনা করে অনেক দূর যেতে চাই। ভালো ফল করেছি, কিন্তু সামনে পড়াশোনার খরচ কীভাবে চালাব— সেটাই বুঝতে পারছি না। সুযোগ পেলে আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।’
সে আরও বলে, ‘পড়ালেখার পাশাপাশি বাবা-মায়ের কাজে সহযোগিতা করেছি সবসময়। মাঝেমধ্যে ভ্যানও চালাতে হয়েছে। আমি ভবিষ্যতে ডাক্তার হতে চাই। কিন্তু সে জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন।
‘যদিও আমি ভালো রেজাল্ট করেছি তবুও আনন্দ নেই। কারণ সামনে যে খরচ লাগবে তা আমার পরিবার দিতে পারবে কি না, এ নিয়ে আমি ভীষণ শঙ্কিত।'’
আবু সাঈদ খুদুরীর পিতা ভ্যানচালক রাশিদুল ইসলাম বলেন, ‘রেজাল্ট শুনি আমি খুব খুশি হইছি। বুকটা আমার ভরি গেইছে। ’
তবে ছেলের পড়শোনার খচর চালানোর অসহায়ত্ব নিয়েও আক্ষেপ তার।
রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার সংসার চলে না। আমি তিন চাকার একটা ভ্যান চালাই। যা আয় হয় তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চালাই। ’
সংসার চালানো নিয়ে হিমশিম খেলেও ছেলেকে নিয়ে তার অনেক বড় আশা।
তিনি বলেন, ‘আমি ওকে (ছেলে) বড় বিদ্বান বানাতে চাই। কিন্তু অর্থের দরকার। যদি কেউ একটু সহযোগিতার হাত বাড়ে দেন তাহলে আমি ওকে পড়াতে পারবো। তাছাড়া আমার একার পক্ষে সম্ভব না। এ জন্য সবার সহযোগিতা চাই।’
আবু সাঈদ খুদুরীর মাতা গৃহিনী শিউলি বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে যতক্ষণ পড়াশোনা করে ততক্ষণ আমি জাগি থাকি। ও যখন ঘুমাই আমিও তখন ঘুমাই। আবার খুব ভোরে ওকে ঘুম থেকে ডেকে তুলি। এরপর সে হাতমুখ ধুইয়া পড়তে বসে। আমিও জেগে থাকি। সকাল হলে রান্না বান্না করি। এরপর মাদ্রাসায় যাওয়ার সময় হলে ওকে গোসল করিয়ে খাওয়ায়ে দেই। এরপর সে মাদ্রাসায় যায়। না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতাম। এই রকম করি ছেলে মানুষ করছি।’
আবু সাঈদ খুদুরী ও তার পরিবারের অসহায়ত্ব সম্পর্কে অবগত আছেন বামনডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর জোব্বার।
তিনি বলেন, ‘পরিবারটি অত্যন্ত গরীব। পরিষদের পক্ষ থেকে সহযোগীতা করা হবে।’
এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘খোঁজ নিয়ে ছেলেটির সহায়তা প্রদানের চেষ্টা করা হবে।’
প্রতিনিধি/এএম




