দীর্ঘ প্রায় দুই বছর আত্মগোপনে থাকার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রকাশ্যে দেখা গেছে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শাহাদাৎ হোসেন শোভনকে। তার প্রকাশ্যে আসার কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে শোভন আত্মগোপনে ছিলেন। তবে রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরের পর থেকে রাত পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার নিজস্ব ‘ছাত্রনেতা শাহাদাৎ হোসেন শোভন ভাই’ নামে আইডি থেকে ‘আজ শহরে রাজা এসেছে!’ ও ‘শহরে আজ রাজা এসেছিলো’ শিরোনামে একাধিক ভিডিও প্রকাশ করা হয়।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে শোভনকে একটি স্পিডবোটে হাত নেড়ে অভিবাদন জানাতে এবং নৌকায় থাকা কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে করমর্দন করতে দেখা যায়।
শোভনের শোডাউন ভিডিওতে জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও পৌর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মিকাইল হোসেন হিমেল, জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল আমীন আফ্রিদি এবং পৌর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর মাওলা ফারানীসহ দুই শতাধিক সমর্থক ও নেতাকর্মীকে দেখা যায়। এসব ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, ভিডিওতে দেখা নৌকার স্থানটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শেখ হাসিনা সড়কের দত্তখলা এলাকার। একই এলাকার ১৫ আগস্টের শোক দিবসের কর্মসূচির একটি ভিডিও ধারণ করা হয়েছে বলেও সূত্রটি জানিয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শোভন কোথায় অবস্থান করছিলেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভিন্ন সময় নানা আলোচনা ও গুঞ্জন ছড়িয়েছে। কখনো তিনি ভারতে, কখনো নেপালে, সৌদি আরবে ওমরাহ ভিসায় এবং মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন, এমন কথাও বিভিন্ন সময়ে শোনা গেছে। তবে এসব তথ্যের কোনোটি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
আরও পড়ুন
প্যারোলে মুক্তি পেয়ে বাবার জানাজায় ছাত্রলীগ নেতা
এদিকে শোভনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। তিনি তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও বর্তমান সরকারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পোস্ট করতেন। পাশাপাশি মিথ্যা মামলা, হামলা ও সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগের প্রতিবাদও করতেন বলে তার অনুসারীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
শোভনের প্রকাশ্যে আসার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিএনপি সমর্থিত ইকরামুল মারজান চৌধুরী জেলা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি ‘ধন্যবাদ জেলা পুলিশ’ লিখে পুলিশের উদ্দেশে একটি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাজিদুর রহমান সাজিদ ফেসবুকে লিখেছেন, ‘কমিটি দেন। কমিটি দেন জেলা/উপজেলা/কলেজ পৌর ওয়ার্ড ইউনিয়ন। প্রয়োজনে আমাকে বাদ দিয়ে দেন কিন্তু কমিটি দেন।’
এর মধ্যেই শোভনের প্রকাশ্যে আসাকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও চ্যালেঞ্জের ঘটনাও ঘটেছে। জেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব সমীর চক্রবর্তী ফেসবুক পোস্টে শোভনকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, ‘আশুগঞ্জের চরে খালে বিলে প্রোগ্রাম করেই এই অবস্থা, তারিখ সময় স্থান নির্ধারিত করে এসো, সামনাসামনি একদিন খেলবো।’
এর জবাবে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের জেলা কমিটির সভাপতি রবিউল হোসেন রুবেল ফেসবুক পোস্টে সমীর চক্রবর্তীকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, ‘হুমকি দেন দাদা, আপনার ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা সবার আছে। তারিখ সময় যখন নির্ধারণ করব, তখন তোমাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমানা তো দূরের কথা, কিশোরগঞ্জের হাওরেও খুঁজে পাব না।’ পাল্টাপাল্টি এসব বক্তব্য ও শোভনের শোডাউনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওগুলো পুলিশের নজরে আসার পর বিষয়টি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ শুরু করেছে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক শাহিনুর রহমান শাহিন বলেন, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা শোভন প্রকাশ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রবেশ করে শোডাউন করলেন, অথচ পুলিশ কিছুই জানে না, এ দাবি অত্যন্ত হাস্যকর। জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি তাহলে কোথায় ছিল। এ ঘটনায় পুলিশের দায়িত্বে গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ওবায়দুর রহমান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওগুলো দেখার পর পুলিশ কাজ শুরু করেছে। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের এ ধরনের কর্মসূচি অবৈধ। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
শোভনের দীর্ঘদিন পর প্রকাশ্যে আসা এবং তার শোডাউনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রতিনিধি/এলএ




