শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

সিজারের পর পেটে গজ রেখে সেলাই, ৫১ দিন পর প্রসূতির মৃত্যু

জেলা প্রতিনিধি, ফরিদপুর
প্রকাশিত: ২১ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৬ এএম

শেয়ার করুন:

সিজারের পর পেটে গজ রেখে সেলাই, ৫১ দিন পর প্রসূতির মৃত্যু

ফরিদপুরে সিজারিয়ান অপারেশনের পর প্রসূতি নারীর পেটের ভেতরে সার্জিক্যাল গজ-ব্যান্ডেজ রেখে সেলাই করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। অপারেশনের ৫১ দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই নারীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার অভিযোগ এনে বিচার দাবি করেছেন নিহতের স্বামী।

নিহত নারীর নাম কনিকা মণ্ডল। তিনি রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামের অশান্ত মণ্ডলের স্ত্রী। মৃত্যুকালে তিনি ৫১ দিন বয়সী একটি কন্যাসন্তান রেখে গেছেন।

নিহতের স্বামী অশান্ত মণ্ডল অভিযোগ করে বলেন, গত ২৯ জুন তার স্ত্রী কনিকা মণ্ডল অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ফরিদপুর শহরের ঝিলটুনির সমরিতা জেনারেল হাসপাতাল লিমিটেডে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক ডা. লক্ষ্মী রানী দত্তের তত্ত্বাবধানে কনিকাকে ভর্তি করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন কনিকা।

1000335774

তিনি আরও বলেন, অপারেশনের পরদিন থেকেই তার স্ত্রীর পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায় এবং তীব্র ব্যথা শুরু হয়। বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো হলেও তিনি বিভিন্নভাবে তা এড়িয়ে যান বলে অভিযোগ করেন অশান্ত। পরে কনিকাকে ফরিদপুর শহরের কয়েকটি হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তার শারীরিক অবস্থার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে ভর্তি করানো সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

পরে গত ৩ জুলাই কনিকাকে রাজধানীর কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ৭ জুলাই ডা. আব্দুল জলিলের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা শুরু হয়। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কনিকার পেটের ভেতরে সার্জিক্যাল গজ-ব্যান্ডেজ থাকার বিষয়টি চিকিৎসকেরা শনাক্ত করেন বলে দাবি করেন অশান্ত।

আরও পড়ুন: নারায়ণগঞ্জে একই পুকুরে ডুবে ৪ শিশুর মৃত্যু

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, একই দিন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কনিকার পেট থেকে ওই সার্জিক্যাল গজ-ব্যান্ডেজ বের করা হয়। এরপর দীর্ঘদিন ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত বুধবার (১৯ আগস্ট) দিবাগত রাত সোয়া ২টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কনিকা মণ্ডল মারা যান।

অশান্ত মণ্ডলের দাবি, ডা. লক্ষ্মী রানী দত্ত হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো একটি বার্তায় তার স্ত্রীর চিকিৎসায় ভুল হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন। ওই বার্তায় লেখা ছিল, ‘দাদা নমস্কার। ভালো থাকুন ঈশ্বরের কাছে সেই প্রার্থনা করি। সব কথার আগে করজোরে ক্ষমা প্রার্থী। ভুল মানুষেরই হয়... আমি ভুল করে ফেলেছি... আবারও ক্ষমা চাচ্ছি দাদা।’

1000335776

এই বার্তার সূত্র ধরে অশান্ত মণ্ডল বলেন, ‘আমার স্ত্রীর পেটে গজ রেখে সেলাই করে দেওয়ার কারণে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর সে মারা গেছে। এখন প্রায় দুই মাসের শিশুটিকে আমি কীভাবে মা ছাড়া বড় করব? আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিচার চাই।’

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফরিদপুর শহরের ঝিলটুনির মুজিব সড়কে অবস্থিত সমরিতা হাসপাতালে গিয়ে ডা. লক্ষ্মী রানী দত্তকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। হাসপাতালের এক কর্মচারী জানান, প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের বাসায় গিয়ে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

আরও পড়ুন: সিএনজিকে সাইড দিতে গিয়ে স্কুলবাস খাদে, প্রাণ গেল শিক্ষার্থীর

পরে ঝিলটুনির টেরাকোটা সংলগ্ন অচিন্ত্য টাওয়ারে চিকিৎসকের বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। সেখানে দারোয়ান নাইম মোল্লা জানান, চিকিৎসক বাসায় আছেন। তবে তাকে যেন কেউ বিরক্ত না করেন, সে বিষয়ে নিষেধ করা হয়েছে।

1000335778

অভিযোগের বিষয়ে সমরিতা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মহশিন শরীফ বলেন, ‘আমার হাসপাতালে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে আমার জানা নেই। তবে বিষয়টি নিয়ে কয়েকজন সাংবাদিক আমাকে ফোন করে জানিয়েছেন যে, এর আগে একটি ঘটনা ঘটেছিল এবং সেই ঘটনার ওই নারী মারা গেছেন।’

এ বিষয়ে ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘আমি বিষয়টি আগে জানতাম না। আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলাম। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর