শীত আসতে এখনও বেশ কিছুটা সময় বাকি। এরই মধ্যে পঞ্চগড়ের সীমান্তবর্তী তেঁতুলিয়ার আকাশে দেখা মিলছে হিমালয়ের বরফঢাকা পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার। আকাশ পরিষ্কার ও মেঘমুক্ত থাকায় গত কয়েক দিন ধরে ভোর ও বিকেলে তেঁতুলিয়াসহ পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে মনোমুগ্ধকর এই পর্বতশৃঙ্গ।
গত মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) পরিষ্কার নীল আকাশে হঠাৎ দৃশ্যমান হয় বরফে মোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা। মুহূর্তেই স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি প্রকৃতিপ্রেমীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে উচ্ছ্বাস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও পর্যটকেরা তেঁতুলিয়ায় আসতে শুরু করেছেন।
ভোরের কোমল আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘার শুভ্র চূড়া যেমন মুগ্ধ করে, তেমনি সূর্যের আলো পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বরফঢাকা শৃঙ্গে দেখা যায় গোলাপি ও লালচে আভা। তবে আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এ দৃশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেঘ ও বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তনের কারণে ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যায় দূরের এই পর্বতশৃঙ্গ।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত অনুকূল আবহাওয়ায় তেঁতুলিয়া থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে দৃশ্যমানতা তুলনামূলক বেশি থাকে। তবে এবার আগস্টের শুরুতেই কয়েক দফা কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মেলায় শীতের আগেই পর্যটন মৌসুমের আমেজ তৈরি হয়েছে।
কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে তেঁতুলিয়ার ঐতিহাসিক ডাকবাংলো, পিকনিক কর্নার ও মহানন্দা নদীর তীরসহ বিভিন্ন স্থানে পর্যটকদের ভিড় বাড়ছে। অনেকেই ভোর থেকেই এসব এলাকায় অবস্থান করছেন কাঙ্ক্ষিত দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করতে।
ডাকবাংলো পিকনিক কর্নারে আসা পর্যটক মেহেদী হাসান মামুন ইসলাম বলেন, ‘হঠাৎ করেই কাঞ্চনজঙ্ঘা চোখে পড়ে। দৃশ্যটি এত সুন্দর ছিল যে সঙ্গে সঙ্গে মুঠোফোনে ছবি তুলে রেখেছি।’
স্থানীয় বাসিন্দা ফরিদ হোসেন বলেন, ‘আজ আকাশ একেবারে পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পর কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। শীতের এত আগে এমন পরিষ্কার দৃশ্য দেখে ভালো লেগেছে।’

নুরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘আগস্টের শুরু থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে। শীতের আগেই পর্যটকদের আনাগোনা শুরু হওয়ায় এবার পর্যটন ব্যবসায় গতি আসবে বলে আশা করছি।’
গণমাধ্যমকর্মী রনি মিয়াজি বলেন, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ তেঁতুলিয়ায় আসতে শুরু করেছেন। ভোর থেকেই অনেকে ডাকবাংলো ও মহানন্দা নদীর তীরে অবস্থান করছেন।’
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায় বলেন, ‘আকাশ পরিষ্কার ও মেঘমুক্ত থাকায় বর্তমানে তেঁতুলিয়ার বিভিন্ন স্থান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে দৃশ্যমানতা কমে যেতে পারে। সাধারণত ভোর ও বিকেলে অনুকূল পরিস্থিতিতে পর্বতশৃঙ্গটি ভালো দেখা যায়।’
কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মেলায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও আশাবাদ তৈরি হয়েছে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে আবাসিক হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, চা-বাগানকেন্দ্রিক ব্যবসা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয় বাড়বে বলে আশা করছেন তারা। শীতের মৌসুম শুরুর আগেই পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে গতি আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে পর্যটন বিকাশের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতিও রয়েছে। পর্যাপ্ত আবাসন, মানসম্মত খাবারের ব্যবস্থা, পর্যটনকেন্দ্রগুলোর পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও যোগাযোগব্যবস্থা আরও উন্নত করা গেলে পঞ্চগড়ে পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
যেভাবে যাবেন
ঢাকার শ্যামলী, গাবতলী ও মিরপুর থেকে বিভিন্ন পরিবহনের বাসে পঞ্চগড় যাওয়া যায়। ট্রেনে যেতে চাইলে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে পঞ্চগড়গামী আন্তঃনগর ট্রেনেও যাওয়া সম্ভব। পঞ্চগড় থেকে সড়কপথে তেঁতুলিয়া যেতে বাস, অটোরিকশা, অটোরিকশাভ্যান ও মাইক্রোবাস পাওয়া যায়।

তেঁতুলিয়ায় পৌঁছে ডাকবাংলো, মহানন্দা নদীর তীর, চা-বাগান, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরসহ আশপাশের দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা যায়। স্থানীয়ভাবে অটোরিকশা, অটোরিকশাভ্যান, স্কুটার ও মাইক্রোবাস ভাড়ার সুযোগ রয়েছে।
শুধু আকাশ পরিষ্কার ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলেই আগামী দিনগুলোতে তেঁতুলিয়ার আকাশে দেখা মিলতে পারে হিমালয়ের বরফঢাকা এই রাজকীয় শৃঙ্গের। সেই আকর্ষণে শীতের আগেই পর্যটকের পদচারণে আরও মুখর হয়ে উঠতে পারে পঞ্চগড়ের উত্তরের এই সীমান্ত উপজেলা।
প্রতিনিধি/এসএস




