সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

বিলুপ্তির পথে ‘কড়া’ সম্প্রদায়, শিক্ষার আলোয় ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন

সুমন চন্দ্র, দিনাজপুর
প্রকাশিত: ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৫০ পিএম

শেয়ার করুন:

বিলুপ্তির পথে ‘কড়া’ সম্প্রদায়, শিক্ষার আলোয় ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন
স্কুলে পড়াশোনায় ব্যস্ত কড়া সম্প্রদায়ের শিশুরা। ছবি: ঢাকা মেইল

বাংলাদেশে অর্ধশতাধিক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের বসবাস। এরই একটি কড়া সম্প্রদায়। সময়ের পরিবর্তনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে এই জনগোষ্ঠী। দিনাজপুরের বিরল উপজেলার হালজায় ঝিনাইকুড়ি গ্রামে এখনো টিকে আছে কড়া সম্প্রদায়ের কয়েকটি পরিবার। দীর্ঘদিন ধরে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে জীবন কাটালেও নতুন প্রজন্মের চোখে এখন বড় স্বপ্ন শিক্ষিত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়া।

কড়া সম্প্রদায়ের পূর্বপুরুষের অনেকেই শিক্ষার সুযোগ পাননি। এমনকি একসময় এই সম্প্রদায়ের কোনো নারী-পুরুষের উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর নজিরও ছিল না। তবে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। একজনের পথ অনুসরণ করে এখন একে একে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে কড়া পরিবারের শিশুরা।

কেউ হতে চায় পুলিশ, কেউ শিক্ষক। কেউ আবার স্বপ্ন দেখছে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার।

দিনাজপুরের বিরল উপজেলার হালজায় ঝিনাইকুড়ি গ্রামে কড়া সম্প্রদায়ের বসবাস। বর্তমানে গ্রামটিতে কড়া সম্প্রদায়ের প্রায় ২৬টি পরিবার রয়েছে। বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে তারা দেশের অন্য মানুষের মতোই বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। তবে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এখনো নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের।

কড়া সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রথম দিকের পথিকৃৎ লাপোল কড়া। নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত শিক্ষাবঞ্চনার চিত্র বদলে তিনি উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান। বর্তমানে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী।

লাপোলের পথ অনুসরণ করে তার বড় ভাই সাপোল কড়া ও ছোট বোন পূর্ণিমা কড়াও দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন।

শুধু তার পরিবারেই নয়, পুরো সম্প্রদায়ের শিশু-কিশোরদের মধ্যেই তৈরি হয়েছে পড়াশোনার আগ্রহ।

হালজায় ঝিনাইকুড়ি গ্রামে কড়া সম্প্রদায়ের প্রায় ১৭ জন সন্তান ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার স্বপ্ন দেখছে।

গ্রামেই রয়েছে রাঙ্গন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে মোট শিক্ষার্থী ১৬৩ জন। এর মধ্যে কড়া সম্প্রদায়ের সাতজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।

কথা হয় তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র বিজয় কড়া ও সন্দ্বীপ কড়ার সাথে। বড় হয়ে বিজয় কড়া হতে চান পুলিশ আর সন্দ্বীপ কড়া হতে চান শিক্ষক।

রাঙ্গন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা বিউটি দেব শর্মা বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে কড়াসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থী রয়েছে। কড়া সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পড়াশোনায় অনেক আগ্রহ রয়েছে। আমরা তাদের পড়াশোনায় সব ধরনের সহযোগিতা করছি।

সহকারী শিক্ষক আবু আনাস বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে সাতজন কড়া সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রথম দিকে তাদের ভাষাগত কিছু সমস্যা হতো। কড়া সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা রয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে সেই সমস্যাগুলো অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে। এখন তারা বাংলা ভাষায় পড়াশোনা করছে।

তিনি আরও বলেন, কড়া সম্প্রদায়ের দুজন বর্তমানে ঢাকায় উচ্চ শিক্ষার জন্য অবস্থান করছে। কিন্তু এই সম্প্রদায়ের নানা সমস্যার কারণে তারা নিজেদের প্রতিভা ঠিকভাবে বিকশিত করতে পারছে না। বিভিন্ন এনজিও ও সরকারি সহায়তা পেলে কড়া সম্প্রদায়কে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছবিলাল চন্দ্র সরকার বলেন, আগে কড়া সম্প্রদায়ের মাত্র তিনজন শিক্ষার্থী এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে সাতজনে দাঁড়িয়েছে। আমাদের স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চলমান রয়েছে। কড়া সম্প্রদায়ের অভিভাবকদের সঙ্গে সমাবেশ করে তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে ভর্তি ও নিয়মিত পড়াশোনার বিষয়ে আরও উৎসাহিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, কড়া সম্প্রদায়ের সন্তানরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে এবং স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় খাবারও পাচ্ছে। পাশাপাশি তাদের উপবৃত্তির বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী লাপোল কড়া বলেন, আমরা বর্তমানে উচ্চ শিক্ষার পর্যায়ে পড়াশোনা করছি। নিজেদের শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। আমাদের সম্প্রদায়ের অন্য শিশুরাও যেন শিক্ষার সুযোগ পায় এবং ভবিষ্যতে উচ্চ শিক্ষায় এগিয়ে আসতে পারে, সেটিই আমাদের স্বপ্ন।

কড়া সম্প্রদায়ের প্রধান যগেন কড়া বলেন, আমরা দিনাজপুরে প্রায় ২৮টি পরিবার আছি। আমাদের সন্তানদের লেখাপড়া করানোর পরও চাকরি পাচ্ছি না। এখন সরকার যদি আমাদের দিকে না দেখে, তাহলে আমাদের সন্তানরা কী করবে?

বিরল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, বিরল উপজেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কড়া সম্প্রদায় রয়েছে। সেখানে তাদের একটি পাঠাগারও রয়েছে। পাঠাগারে পড়াশোনার সমস্যার কথা জানার পর সেখানে ফ্যানের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, তারা যাতে সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে পারে এবং তাদের যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে- সেগুলো দূর করার জন্য একাধিকবার সভা করা হয়েছে। সরকারি বিদ্যালয়ে তাদের শিক্ষার্থী ভর্তির হার ধীরে ধীরে বাড়ছে। বর্তমান সরকারের বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণও বিতরণ করা হচ্ছে। এতে কড়া সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করছি।

প্রতিনিধি/এলএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর