রোববার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

‘গরিবের পেটে এখন যেন লাথি পড়েছে’

জেলা প্রতিনিধি, রাজবাড়ী
প্রকাশিত: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২৫ পিএম

শেয়ার করুন:

‘গরিবের পেটে এখন যেন লাথি পড়েছে’
রাজবাড়ী কাঁচাবাজার। ছবি: ঢাকা মেইল

টানা বর্ষণকে অজুহাত করে রাজবাড়ীর কাঁচাবাজারে সবজির দামে আগুন লেগেছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের সবজির দাম। কোনো কোনো সবজির দাম দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। সীমিত আয়ের বাজারদরে এই অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির কারণে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা।

রাজবাড়ী শহরের প্রধান কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, বৃষ্টির কারণে বাজারে সবজির সরবরাহ কমায় প্রায় প্রতিটি পণ্যের দামই ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

ঢেঁড়স: আগে ১৫-২০ টাকা বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা কেজি, কাঁচামরিচ: ৭০–৮০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৮০ টাকা/কেজি, পটল: ২৫-৩০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ টাকা কেজি, ঝিঙে: ৩০ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা কেজি, ধুন্দল: ২০ টাকা থেকে বেড়ে ৫০ টাকা কেজি, উস্তা: ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০ টাকা কেজি, মিষ্টি কুমড়া: ২৫-৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৫০ টাকা কেজি, কাকরোল: ৩০–৪০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ টাকা কেজি, কচুরমুখী: ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ টাকা কেজি, লাউ (মাঝারি আকারের): ৪০ টাকার লাউ বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়, বর্তমানে বাজারে তুলনামূলক কম দামের সবজি হিসেবে কেবল পেঁপে পাওয়া যাচ্ছে, যার দাম কেজিপ্রতি ৪০ টাকা।

রিকশাচালক মোস্তফা মিয়া বলেন, সারা দিন রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে রিকশা চালিয়ে যা আয় হয়, তার অর্ধেকের বেশিই যদি দুই-এক কেজি সবজি কিনতে চলে যায়, তবে চাল-ডাল কিনব কী দিয়ে? কয়েকদিন আগে যে ঢেঁড়স ১৫-২০ টাকায় কিনছি, তা নাকি এখন ৬০ টাকা! কাঁচামরিচ হাত দেওয়া যায় না, ২০০ টাকা কেজি। দিন শেষে ২০০-৩০০ টাকা ঘরে নিয়ে যাই, সেই টাকায় এখন পরিবারের জন্য শুধু পেঁপে আর আলু ছাড়া কিছু কেনার সাহস পাই না। আমাদের মতো গরিবের পেটে এখন যেন লাথি পড়েছে।

বেসরকারি চাকরিজীবী রাসেল সেখ বলেন, মাস শেষে নির্দিষ্ট বেতনের একটা টাকা হাতে পাই, কিন্তু বাজারের খরচ যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তাতে পুরো বাজেট এলোমেলো হয়ে গেছে। এক সপ্তাহে সবজির দাম দ্বিগুণ-তিন গুণ হওয়া কোনো স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না। বৃষ্টির অজুহাত দিয়ে দাম বাড়ানো হচ্ছে, কিন্তু আমাদের বেতন তো আর বৃষ্টি দেখে বাড়ছে না! আগে মাসে যে টাকা সবজি বাবদ বরাদ্দ রাখতাম, এখন তার দ্বিগুণ টাকা দিয়েও পরিবারের চাহিদামতো সবজি কিনতে পারছি না। হিসাব মেলাতে গিয়ে এখন অন্য সব খরচ ছাঁটাই করতে হচ্ছে।

গৃহিণী রোকেয়া বেগম বলেন, সংসার চালানো এখন আমাদের জন্য একটা বড় যুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রান্নাঘরে এসে প্রতিদিন চিন্তা করতে হয় আজ কী রাঁধব। যে লাউ ৪০ টাকায় পাওয়া যেত, সেটা এখন ৭০ টাকা, পটলের কেজি ৬০ টাকা! পরিবারের মানুষগুলো তো আর বোঝে না বাজারে দাম বেড়েছে, তারা পাতে একটু ভালো তরকারি চায়। বাজার থেকে যা নিয়ে আসি, তা দিয়ে কোনো মতে দিন পার করতে হয়। পেঁপে ছাড়া কম দামে আর কোনো সবজিই পাওয়া যাচ্ছে না। এমন অবস্থা চলতে থাকলে বাচ্চাদের পুষ্টিকর খাবার দেওয়া তো দূরের কথা, সাধারণ তরকারি রান্না করাই বন্ধ হয়ে যাবে।

মেসে থাকা শিক্ষার্থী সাজিদ হাসান বলেন, আমরা রাজবাড়ী সরকারি কলেজে পড়ি এবং কয়েকজন বন্ধু মিলে মেসে থাকি। মাস শেষে আমাদের একটা নির্দিষ্ট পকেটমানি বা মেস বাজেট থাকে। কিন্তু বাজারের এই অবস্থায় আমাদের মেসের মিল চার্জ দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার উপক্রম! আগের মতো তরকারি রান্না করা তো এখন বিলাসী চিন্তা। পেঁপে আর আলু ছাড়া আমাদের অন্য কোনো সবজি কেনার ক্ষমতা নেই। কাঁচামরিচের যে দাম, তরকারিতে ঝাল দেওয়াও কমিয়ে দিতে হয়েছে। পড়াশোনার চিন্তার চেয়ে এখন মেসের বাজেট কীভাবে সামলাব, সেই চিন্তাতেই দিন কাটছে।

সবজিবিক্রেতা রাজু মণ্ডল ও পাইকারি ব্যবসায়ী ইমান আলী জানান, অতিবৃষ্টি ও টানা বর্ষণে মাঠের অনেক কৃষিজমির সবজি নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে বিভিন্ন এলাকা থেকে সবজির সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় আড়তেই চড়া দামে সবজি কিনতে হচ্ছে, তাই বাধ্য হয়ে খুচরা বাজারেও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টির কারণে স্বাভাবিকভাবেই সবজির উৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলে বাজারে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়ে সাময়িকভাবে দাম বাড়ে। এটি একটি সাময়িক পরিস্থিতি। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে এবং নতুন উৎপাদন বাজারে এলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, রাজবাড়ী জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. মাহমুদুল হাসান বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জানান, টানা বৃষ্টির কারণে শুধু রাজবাড়ী নয়, সারা দেশেই সবজির ক্ষতি হয়েছে এবং বাজারে আমদানি কমে গেছে। ফলে দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্বাভাবিক রাখতে আমরা নিয়মিত মনিটরিং করছি। কোনো অসাধু ব্যবসায়ী যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দাম নিতে না পারে, সে জন্য আর্থিক জরিমানাসহ প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

তবে অতিবৃষ্টির সুযোগে কোনো অসাধু চক্র যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াতে না পারে, সেজন্য কাঁচাবাজারে কার্যকর তদারকি ও মনিটরিং জোরদার করার জোর দাবি ভুক্তভোগী ক্রেতাদের।

প্রতিনিধি/এলএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর