শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

আম উৎপাদনে সফল আনছার আলী, লক্ষ্য এখন বিশ্ববাজার

সুমন চন্দ্র, দিনাজপুর
প্রকাশিত: ০৪ জুলাই ২০২৬, ১১:৪৭ এএম

শেয়ার করুন:

আম উৎপাদনে সফল আনছার আলী, লক্ষ্য এখন বিশ্ববাজার

এক টুকরো জমি আর বড় স্বপ্ন—এই দুটিকেই পুঁজি করে এগিয়ে গেছেন দিনাজপুরের আনছার আলী। বিরল উপজেলার রাজারামপুর ইউনিয়নে তিনি গড়ে তুলেছেন আধুনিক আম বাগান, যা এখন এলাকার কৃষি উন্নয়নের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তার সফলতা প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দৃঢ় উদ্যোগ থাকলে কৃষিই হতে পারে সমৃদ্ধির অন্যতম চাবিকাঠি। স্বপ্নবাজ আনছার আলীর লক্ষ্য এখন বিশ্ববাজার।

তার বাগানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উন্নত জাতের আম চাষ করে ইতোমধ্যে এলাকায় সাড়া ফেলেছেন তিনি। এ সফলতার পেছনে বিরল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিয়মিত সহযোগিতা, কারিগরি পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, পরিচর্যা ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কৃষি বিভাগের পরামর্শ গ্রহণ করে তিনি আরও উন্নত ও লাভজনক আম উৎপাদনে সক্ষম হয়েছেন।

জানা যায়, ২০২০ সালে আনছার আলী ব্যানানা ম্যাংগো আম কিনতে গিয়েছিলেন। তখন থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা এই আমের দাম চাওয়া হয়েছিল প্রতি কেজি ৭৫০ টাকা। এত বেশি দাম দেখে তিনি আমটি না কিনে ভিন্নভাবে চিন্তা করেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে দুটি গাছ লাগাবেন। যদি ফলন ও স্বাদ ভালো হয়, তাহলে নিজেই বাণিজ্যিকভাবে বাগান গড়ে তুলবেন। সেই ভাবনা থেকেই কয়েক বছর আগে সীমিত পরিসরে আম চাষ শুরু করেন আনছার আলী। সময়ের সঙ্গে তার পরিশ্রম, যত্ন ও পরিকল্পনার ফলে বর্তমানে তার বাগানটি একটি মডেল বাগানে পরিণত হয়েছে। বাগানে রয়েছে ব্যানানা ম্যাংগো, কাটিমন, চিয়াংমাই, কিং অফ চাকাপাত, আর টু ইটুসহ বিভিন্ন উচ্চ ফলনশীল ও সুস্বাদু জাতের আম।

054d7cb3-849f-4dac-8eec-3a926efcd589

নিয়মিত পরিচর্যা এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তিনি শুধু ফলনের পরিমাণই নয়, আমের গুণগত মানও নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তার এই উদ্যোগ এখন এলাকার অন্যান্য কৃষকদের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।

বাগান দেখতে আসা লিটন কুমার রায় বলেন, আমি এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় লক্ষ্য করলাম, আমগুলো ব্যাগের মধ্যে ঝুলছে। বিষয়টি আমার কাছে বেশ ব্যতিক্রমী মনে হওয়ায় সেটি কাছ থেকে দেখার জন্য বাগানে প্রবেশ করি। আমগুলো দেখে আমার খুব ভালো লেগেছে। এগুলো দেখে আমারও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আমারও একটি জমি রয়েছে যেখানে আমের বাগান করা সম্ভব। তাই, আমি তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে আগামী বছর আমের বাগান করার পরিকল্পনা করছি।

স্থানীয় কৃষক বিমল বলেন, এই বাগানে আম চাষের নতুন এই পদ্ধতি দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি। বিশেষ করে ব্যাগের মধ্যে আম ঝুলিয়ে রাখার বিষয়টি আমার কাছে বেশ ব্যতিক্রম ও আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। এতে আমের গুণগত মান ভালো থাকে এবং পোকামাকড়ের আক্রমণও কম হয় বলে জানতে পেরেছি। এমন উদ্যোগ আমাদের মতো কৃষকদের নতুনভাবে ভাবতে উৎসাহিত করছে। সুযোগ পেলে আমরাও ভবিষ্যতে এই ধরনের আধুনিক পদ্ধতিতে আম চাষ করার চেষ্টা করব।

de2ed527-155a-4c1b-9b61-77b9d1b4f79d

কৃষক আনছার আলী বলেন, ২০২০ সালে আমি ব্যানানা ম্যাংগো আম কিনতে গিয়েছিলাম। তখন প্রতি কেজি আমের দাম চাওয়া হয়েছিল ৭৫০ টাকা। আমগুলো ছিল থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা। এত বেশি দামে আম না কিনে আমি ভাবলাম, দুটি গাছ লাগিয়ে দেখি। যদি আমের স্বাদ ভালো হয়, তাহলে ভবিষ্যতে নিজেই বাগান করব। সেখান থেকেই আমার ব্যানানা ম্যাংগো চাষের যাত্রা শুরু।

তিনি বলেন, ২০২১ সালে আমার গাছে প্রথম আম আসে। আমগুলো খেতে ছিল অত্যন্ত সুস্বাদু ও মিষ্টি। তখন আমার মনে হলো, যদি আমাদের দেশ থেকেও এই বিদেশি জাতের আম রপ্তানি করা যায়, তাহলে তা দেশের জন্যও ভালো হবে। সেই চিন্তা থেকেই ২০২২ সালে আমি ৬৫০টি গাছ রোপণ করি। ২০২২ সালে গাছ লাগানোর পর ২০২৩ সালে আমার বাগানে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আম উৎপাদন শুরু হয়। এরপর ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো আমার উৎপাদিত আম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে রপ্তানি হয়।

তিনি আরও বলেন, আমার আমবাগান পরিচালনার ক্ষেত্রে কৃষি অফিস থেকে আমি প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছি। আমার বাগানে যারা কাজ করেন, তারাও প্রশিক্ষণ পেয়েছে। এছাড়া এখানকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সার্বক্ষণিকভাবে আমার বাগানের খোঁজখবর রাখেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করেন।

b5eef51d-d3f1-4d47-9618-dacc61edddea

আনছার আলী বলেন, বিদেশে রপ্তানির উপযোগী করে আম উৎপাদনের জন্য আমরা গ্যাপ অনুসরণ করে চাষাবাদ করি। রাসায়নিক বালাইনাশক ও ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে নিরাপদ ও মানসম্মত আম উৎপাদনের দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, এ বছরও আমার বাগানের আম দেশের বাইরে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আফজালুর রহমান বলেন, আনছার আলীর বাগান থেকে প্রতিবছরই বিদেশে আম রপ্তানি করা হয়। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এবারও শুরু থেকেই বাগানের মাটি পরীক্ষা, সারের সঠিক ব্যবহার এবং পানির মান পরীক্ষা করা হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত পরামর্শ প্রদান এবং গ্যাপ প্রটোকলের সব নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এছাড়া বাগানের এমআরএল পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে। বাগানে নিয়মিত আগাছা দমন করা হয়েছে এবং রোগাক্রান্ত ডালপালা ছাঁটাই করা হয়েছে। ফ্রুট ফ্লাই দমনের জন্য ব্যাগিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আনছার আলীকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আমরা চাই, এ ধরনের উদ্যোগ আরও কৃষকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক এবং তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হোক।

প্রতিনিধি/টিবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর