বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ঢাকা

চিত্রা নদীর তীরে বটের ছায়ায় শতবর্ষী রতডাঙ্গার হাট

মো. হাবিবুর রহমান, নড়াইল
প্রকাশিত: ০৪ জুন ২০২৬, ১১:৪৪ এএম

শেয়ার করুন:

চিত্রা নদীর তীরে বটের ছায়ায় শতবর্ষী রতডাঙ্গার হাট

চিত্রা নদীর তীরে বিশাল আকৃতির বটগাছ। বটগাছের ডালগুলো মাথা উঁচু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তার নিচে শীতল ছায়ায় বসেছে হাট। হাট বিস্তৃত হয়েছে আশপাশের জায়গা জুড়ে।

হাটের নাম রতডাঙ্গার হাট। রতডাঙ্গা গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে চিত্রা নদী। নদী পারাপারের পর সিঁড়ি বেয়ে উঠতে চোখে পড়ে বিশাল এক বটগাছ। আকাশচুম্বী বটগাছের নিচে সুশীতল ছায়া। সেই ছায়ায় বসে রতডাঙ্গার হাট।


বিজ্ঞাপন


নড়াইল জেলা শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার চন্ডিবরপুর ইউনিয়নের চিত্রা নদীর তীরের এ হাটের বয়স ২০০ বছরের বেশি। আগের মতো জৌলুস না থাকলে ও ঐতিহ্যবাহী এ হাট এখনো বেচাকেনায় সরগরম হয়ে ওঠে।

বটগাছের ছায়াঘেরা জায়গায় প্রতিদিনই সকাল বিকাল কেনা-বেচা শুরু হয়, চলে রাত পর্যন্ত। তবে সপ্তাহে দুই দিন শুক্রবার ও সোমবারে বসে হাট। অন্য দিনগুলোতে নিয়মিত বাজার বসে। রতডাঙ্গা গ্রামসহ আশপাশের চার পাঁচটি গ্রাম থেকে এ হাটে কেনা-বেচা করতে লোক আসেন। হাটের পাশেই নদীর তীর ঘেঁষে রতডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়। স্কুল শিক্ষার্থীরা টিফিন সময়ে বটগাছের শীতল ছায়ায় এসে ভিড় করেন। 

সরেজমিনে রতডাঙ্গায় দেখা যায়, হাটের মাঝখানে বিশাল আকৃতির বটগাছ। বটগাছের নিচে কেউ দোকান করে বসে আছেন, কেউ বা অস্থায়ী সেলুন, আবার কেউ বিক্রি করছেন পান আবার কেউ সবজি। বটগাছের দুই পাশ দিয়ে সারি সারি আধাপাকা দোকানঘর। বেশির ভাগ দোকান টিনের তৈরি ও জরাজীর্ণ। দোকান, দোকান ঘরের বারান্দায় এবং দোকানঘরের সামনে বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। ফাঁকা জায়গা তাবু টানিয়ে বসেছেন অস্থায়ী দোকান। সেখানে চলছে বেচাকেনা। ক্রেতারা দোকান ঘুরে ঘুরে দেখছেন। কেউ দরদাম করছেন, আবার কেউ ব্যাগ ভরে পছন্দের সবজি কিনছেন।

e0d5fa76-cba9-4705-bc58-69f3e22b27c6


বিজ্ঞাপন


স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চিত্রা নদীতে এক সময় বড় বড় নৌকা, ট্রলার, লঞ্চ, স্টিমার চলত। নৌকায় করে এ হাটে ব্যবসায়ীরা আসতেন। হাট থেকে সবজি, মাছ, মাংস, গুড়, পাটালি, মাটির তৈজসপত্র কেনা-বেচা করে পুনরায় নৌপথে বাড়ি ফিরে যেতেন।

বটগাছের নিচে ৩৫ বছর ধরে পান বিক্রি করা নিরাপদ বিশ্বাস বলেন, বটগাছের শীতল ছায়ায় দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে আমি পান বিক্রি করছি। প্রতি হাট বারে বেচাবিক্রি বেশি হয়। প্রতিদিন টুকটাক যা আয় হয় তাতেই আমার সংসার চলে।

বটগাছের বয়স আনুমানিক ২০০ বছর বয়স দাবি করে এ পান ব্যবসায়ী বলেন, আমার বাব-দাদারা বটগাছটি যে রকম দেখে গেছে আমরা ও সেই একই রকম দেখছি। আমার ছেলে মেয়েরা ও একই রকম দেখছে। কত বছর আগে কে এই গাছ লাগিয়েছিলেন বা কি ভাবে হল কেউ বলতে পারে না। বট গাছটি যেমন পুরনো, রতডাঙ্গার এ হাট তেমনি পুরনো।

বটগাছের নিচে অস্থায়ী একটি সেলুন বসিয়ে চুলে কাটাচ্ছেন হারান পরামানিক। কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, অনেক আগে থেকেই বট গাছ তলায় চেয়ার বসিয়ে এভাবেই চুল দাঁড়ি কাটাই। প্রতিদিন সকালে আসি, বিকালে বাড়ি যাই। রতডাঙ্গা গ্রামটি অনেক বড় গ্রাম। গ্রামের মানুষ ঠান্ডা জায়গা পেয়ে চুল কাটাতে আসেন। আনুমানিক ২০০ বছরের পুরোনো এই রতডাঙ্গার হাটের অনেক সুনাম রয়েছে। তাই বিভিন্ন জায়গা থেকে এ হাটে মানুষ আসেন।

বটগাছের নিচে তাবু টানিয়ে আলু, পটল, মরিচ, বেগুন কাঁচা সবজি সাজিয়ে বসেছেন সদর উপজেলার রতডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা রুহুল আমিন (৭৫)। তিনি বলেন, ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে এই হাটে কাঁচা সবজি বিক্রি করি। আগে হাটে প্রচুর লোকের সমাগম হতো। ব্যবসায়ীরা জিনিসপত্র কিনতে নৌকায় করে আসতেন। এখন আর নৌকা আসে না। বেচাকেনা কম। তবে এই বট গাছ ও হাটের বয়স ২০০ বছরের বেশি হবে।

নড়াইল পৌরসভা এলাকা থেকে গ্রামের এ হাটে এসেছেন শাহারিয়াল ইসলাম। তিনি বলেন, ছোট বেলা থেকে বাবার সঙ্গে নৌকা পার হয়ে এই হাটে আসতাম। সেই অভ্যাস থেকে গেছে, আমি ও প্রতিহাট বারে এ বাজার থেকে সবজি কিনি। মাঝে মাঝে বন্ধুদের নিয়ে বট তলায় আড্ডা দিতে আসি। সব চেয়ে মজার বিষয় রতডাঙ্গার এই হাটে আড়াই টাকায় সিঙ্গাড়া পাওয়া যায়। খেতে খুবই সুস্বাদু। মচমচে এই সিঙ্গাড়া খেতে বন্ধুদের নিয়ে চলে আসি।

চিত্রার পাড়ের শতবর্ষী এ বটগাছটি সংরক্ষণের জন্য রতডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দারা একত্রিত হয়ে ২০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছেন। যার নাম দিয়েছেন রতডাঙ্গা বাজার বটগাছ সংরক্ষণ কমিটি।

d387efc6-01cd-42d1-92df-98bb3769e09d

রতডাঙ্গা বাজার বটগাছ সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি জাহিদ হোসেন বলেন, গাছটি অনেক পুরাতন গাছ। গাছটি আমার বাবা দেখেছে যেমন, দাদাও দেখছে। গাছটি ৫ থেকে ৬শত বছরের পুরনো গাছ। গাছটির কারণে বাজারের একটা ঐতিহ্য আছে। গাছটি যাতে আমরা সংরক্ষণ করতে পারি, কেউ কোনো ক্ষয়ক্ষতি করতে না পারে, ডাল পালা না কাটে সেইভাবে আমরা দেখাশোনা করি। গাছটির কারণে বাজারের ছোট দোকানগুলো নিরাপদে থাকে।

চন্ডিবরপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বলেন, চন্ডিবরপুর ইউনিয়নের রতডাঙ্গার হাটটি ঐতিহ্যবাহী একটি হাট। ব্রিটিশ আমলে চিত্রা নদীর পাড়ে বটবৃক্ষের নিচে এ হাট গড়ে ওঠে। এ হাটে দেশীয় ফল, মাছ, সবজি, গুড়, মধুর জন্য বিখ্যাত। বহুকাল থেকে এ হাটে মানুষ বেচাকেনা করে আসছেন। বিশেষ করে বটগাছটির কারণে এই জায়গাটি সব সময় লোকে ভরপুর থাকে। গাছের শীতল ছায়া এ দিয়ে নদীর হাওয়া। মানুষের ফ্যানের দরকার পড়ে না।

প্রতিনিধি/টিবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর