নোয়াখালী সদরে জমি নিয়ে বিরোধ এবং পূর্ব শত্রুতার জেরে বিএনপি ও যুবদল নেতার নেতৃত্বে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগসহ গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলায় এক অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুসহ অনেকেই গুরুতর জখম হয়েছেন। এ সময় তারা একটি ঘর ও এক্সকেভেটর পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। একইসঙ্গে খাদ্য সামগ্রী, নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোন ও গবাদিপশু লুটপাটেরও অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় মঙ্গলবার (২ জুন) দুপুরে ভুক্তভোগী নাইমুর রহমান মিতুল (৪৮) বাদী হয়ে অভিযুক্ত ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আলাউদ্দিন মহুরী ও ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি আলমগীর মুহুরি, কামাল উদ্দিন ও পারভেজ আলমসহ ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২০/২৫ জনকে আসামি করে সুধারাম মডেল থানায় একটি এজাহার দায়ের করেছেন। এর আগে রোববার ও সোমবার দুই দফায় হামলা চালায় তারা।
বিজ্ঞাপন

এজাহার সূত্রে জানা যায়, বাদী নাইমুর রহমান মিতুল ও তার পরিবার নোয়াখালীর সদর এজবালিয়া মৌজার পৈতৃক ও খরিদ সূত্রে মালিক হন। আসামিরা জমির দলিল তৈরি করে আদালতে মামলা করলে আদালত স্থগিতাদেশ প্রদান করে।
আদালতের স্থগিতাদেশ করলেও আলমগীর ও আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে ২৫-৩০ জন সন্ত্রাসী ছেনি, লোহার রড, পেট্রোল, ককটেলসহ দেশীয় অস্ত্রে দিয়ে হামলা চালায়।
আসামিরা এলোপাতাড়ি কুপিয়ে কামাল উদ্দিনসহ তৈমুর রহমান মুকুলকে হত্যার উদ্দেশে জখম করে ফেলে যায়। এ সময় তাদের রক্ষা করতে এলে আহত জাহাঙ্গীর আলমের মেয়ে ৪ মাসের অন্তঃসত্ত্বা শারমিন আক্তারকেও মারধর করে তার পেটে আঘাত করে ফেলে চলে যায়।
বিজ্ঞাপন

এ সময় তারা মাটি কাটার একটি এক্সকেভেটর ও বসতভিটায় আগুন ধরিয়ে দিয়ে মালামাল, আসবাবপত্র, গাবাদিপশু, নগদ অর্থ ও খাদ্য সামগ্রী লুট করে নিয়ে যায়। একটি এক্সকেভেটর ও ঘর আগুন দিয়ে ভস্মীভূত করে দেয়। পরে আহতদের চিৎকার শুনে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে আশঙ্কাজনক অবস্থায় নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল ভর্তি করায়। এদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়।
এ ঘটনায় আহত জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী রোকেয়া আক্তার বলেন, সন্ত্রাসীরা আমার স্বামীকে এলোপাতাড়ি মারধর করার সময় আমার মেয়ে চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা, সে তার বাবাকে বাঁচাতে এলে তাকেও মারধর করে, তার বাচ্চাকে পানিতে ফেলে দেয়। আমি গিয়ে আমার নাতিকে উদ্ধার করি।
আহতের ভাই বলেন, সাড়ে তিনটার দিকে আমরা এখানে কাজ করছিলাম, তখন আলমগীর, আলাউদ্দিন ফারুক ও কামালের নেতৃত্বে ২৫-৩০ জনের একদল সন্ত্রাসী এসে প্রথমে আমাদের (বেকু বা এক্সকেভেটর) মধ্যে আগুন লাগাই দিছে, পরে টিনের ঘরে আগুন লাগাই দিছে। টিনের ঘরে আগুন লাগাই দিবার পরে মহিলাদেরকে মারধর করছে। ওনাদের বসত ঘরে সয়াবিনের বস্তা ছিল ১৫-২০টি, সেগুলো নিয়ে গেছে এবং এই ঘরে আসি আমার ভাইয়ের ঘর থেকে বের করি পথে কুপিয়েছে। আমার ভাইয়ের মেয়ে প্রেগন্যান্ট, তাকে মারছে, হের এখন রক্তক্ষরণ হইতেছে। নোয়াখালী সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। তার বাচ্চারে গলায় ধরে পানিতে ফালাইছে।

ভুক্তভোগী নাইমুর রহমান বলেন, এই জমি আমি পৈতৃক সূত্রে মালিক। এখানে আমার জমি ১২ একর ২০ ডিসিম, এটার ভেতরে ১ একর ১০ ডিসিম জমি তারা দাবি করলে আমি আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের রায়ের মাধ্যমে আমি জয়লাভ করি। পরে আমরা জায়গা দখল করার আগে আমাদের জায়গায় কাজ করলে অতর্কিতভাবে বিএনপি ও যুবদল আলমগীর, আলাউদ্দিন, সাইদুল মেম্বারের নেতৃত্বে আমরা চারজন বসা থাকা অবস্থায় আমার ভাই এবং আমার ভাগিনাকে বেদম মারধর করে। এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। নারী, শিশুসহ কয়েকজনকে হামলা করে। আমার ঘরবাড়িতে আক্রমণ করে আগুন দেয়। আমার রবিশস্য, গরু, মোবাইল, টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালংকার সব চুরি করে নিয়ে যায়। আমি এ ঘটনাটি সুস্থ তদন্ত এবং বিচার দাবি করতেছি।
তাৎক্ষণিক থানায় খবর দেওয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।
নাইমুর রহমান জানান, হামলায় নেতৃত্বদানকারী ছায়েদুল হক আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং সাবেক ইউপি সদস্য। এ ছাড়া আলমগীর হোসেন এওজবালিয়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক। আর আলা উদ্দিন ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে আলমগীর হোসেন বলেন, ওই জায়গা বিগত ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে পৈতৃকভাবে তারা ভোগ দখল করে আসছেন। বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নাইমুর রহমান তার ভগিনীপতি জেলা বিএনপির সদস্যসচিব হারুন রশিদের নাম ভাঙিয়ে দখলের চেষ্টা করছে। এই ঘটনায় এলাকার লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের প্রতিহত করেছে।
আলমগীর হোসেন বলেন, নাইমুরের লোকজনই তাদের ঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের নাটক সাজিয়েছে। হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় তাদের কেউ জড়িত ছিল না। তা ছাড়া ঘটনার সময় তিনি কিংবা তাদের পক্ষের কোনো লোকও সেখানে ছিল না।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে সুধারাম থানার পরিদর্শক (অপারেশন) শ্রী রাম চন্দ্র ভট্রাচার্য বলেন, হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের খবর পেয়ে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে পুলিশ গিয়ে হামলাকারীদের কাউকে পায়নি। ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রতিনিধি/এসএস




