সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ঢাকা

ঘূর্ণিঝড় আইলার ১৭ বছরেও কাটেনি উপকূলের ক্ষত, টেকসই বেড়িবাঁধের অপেক্ষা

গাজী ফারহাদ, সাতক্ষীরা
প্রকাশিত: ২৫ মে ২০২৬, ১১:৩১ এএম

শেয়ার করুন:

ঘূর্ণিঝড় আইলার ১৭ বছরেও কাটেনি উপকূলের ক্ষত, টেকসই বেড়িবাঁধের অপেক্ষা

আজ ভয়াল ২৫ মে। ২০০৯ সালের এই দিনে প্রয়োগকারী ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে যায় সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় জনপদ। ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি শ্যামনগর, আশাশুনি, খুলনার কয়রা ও দাকোপ এলাকার লাখ লাখ মানুষ। আজও সুপেয় পানি, টেকসই বেড়িবাঁধ, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও নিরাপদ বাসস্থানের সংকটে মানবেতর জীবন কাটছে উপকূলবাসীর।

একসময় সবুজ বনানী, ধান, পাট ও শাক-সবজিতে ভরপুর ছিল সাতক্ষীরার গাবুরা, পদ্মপুকুর ও প্রতাপনগর ইউনিয়ন। এখন সেখানে চোখে পড়ে শুধু লবণাক্ত পানির ঘের আর অনাবাদি জমি। আইলার পর লবণাক্ততা এতটাই বেড়েছে যে অধিকাংশ জমি কৃষিকাজের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ধীরে ধীরে বৃক্ষশূন্য হয়ে যাচ্ছে পুরো অঞ্চল।


বিজ্ঞাপন


স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ২০০৯ সালের ২৫ মে সকালে আবহাওয়া স্বাভাবিকই ছিল। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। কেউ বুঝতে পারেননি দুপুরের পর ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস ধেয়ে আসবে। মুহূর্তের মধ্যে ১৪ থেকে ১৫ ফুট উচ্চতার লোনাপানির ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে যায় ঘরবাড়ি, গবাদিপশু, ফসল ও মানুষের জীবন।

483855c3-0d13-4611-a19e-5de57c656cd4

গাবুরার বাসিন্দা এক নারী বলেন, আইলার পরে আমাদের অনেক কষ্ট। গরু-ছাগল, জমি-জমা কিছুই আর নেই।

আরেকজন বলেন, এখনও অনেক মানুষের ঘরদোর নেই। ঝড়-বৃষ্টি হলেই কাপড়চোপড় গুটিয়ে স্কুলে আশ্রয় নিতে হয়।


বিজ্ঞাপন


স্থানীয়দের কেউ কেউ এখনও স্বজন হারানোর বিভীষিকা ভুলতে পারেননি। এক বৃদ্ধ জানান, আমার মেয়ে আর নাতনি আইলায় মারা গিয়েছিল। অনেকের লাশও পাওয়া যায়নি।

অন্য একজন বলেন, আমরা ২০ জন নৌকায় পালাচ্ছিলাম। এর মধ্যে আমার মাকে নিয়ে ১১ জন ডুবে মারা যায়।

শ্যামনগর উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, আইলার আঘাতে শুধু সাতক্ষীরাতেই ৭৩ জন নারী, পুরুষ ও শিশু নিহত হন। আহত হন দুই শতাধিক মানুষ। তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৫ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। শ্যামনগর উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২ লাখ ৪৩ হাজারের বেশি মানুষ। বিধ্বস্ত হয় ১ লাখ ৪২ হাজারের বেশি বসতঘর, শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। প্রায় ১১৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

উপকূলের মানুষ এখনও সবচেয়ে বেশি ভুগছেন সুপেয় পানির সংকটে। অনেক এলাকায় পুকুর ও জলাশয়ের পানি লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করে জীবন চালাতে হচ্ছে মানুষকে। এনজিওগুলোর স্থাপন করা অনেক পানি বিশুদ্ধকরণ ব্যবস্থা এখন অকেজো।

e98425d3-bf53-441c-84ef-78cd5ad4febd

গাবুরা ইউনিয়নের এক বাসিন্দা বলেন, আমরা পানির মধ্যে থাকি, কিন্তু খাওয়ার পানি পাই না।

আরেকজনের ভাষ্য, গাবুরার মাটিতে লোনা পানি। ফসল হয় না। সরকার যেন কৃষিকাজের ব্যবস্থা করে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আইলার পর যেসব বেড়িবাঁধ সংস্কার করা হয়েছে তার বেশির ভাগই অস্থায়ী। বর্ষা মৌসুম এলেই নতুন করে আতঙ্ক শুরু হয়। নদীর জোয়ার বাড়লে রাত জেগে পাহারা দিতে হয় অনেক পরিবারকে।

উপকূলীয় অঞ্চলে কর্মসংস্থানের অভাবও প্রকট আকার ধারণ করেছে। কৃষিকাজ কমে যাওয়ায় চিংড়ি ঘেরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে অধিকাংশ পরিবার। কিন্তু সেখানে সবার কাজের সুযোগ নেই। ফলে জীবিকার সন্ধানে প্রতিবছর বহু মানুষ এলাকা ছেড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, লবণাক্ততার প্রভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আর্সেনিক সমস্যা, অপুষ্টি, রোগব্যাধি, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ ও দারিদ্র্য বেড়েছে উপকূলজুড়ে।

স্থানীয়দের দাবি, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সুপেয় পানির স্থায়ী ব্যবস্থা, কৃষি পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান ছাড়া উপকূলবাসীর দুর্ভোগ কমবে না।

আরও পড়ুন

দুই লাখ টাকার রাস্তা ভেঙে গেল একদিনেই

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, জাইকার অর্থায়নে কিছু এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ২৭ কিলোমিটার বাঁধের কাজ চলমান রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আরও ১৯৬ কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হলে গাবুরাসহ উপকূলীয় এলাকা অনেকটা সুরক্ষিত হবে।

তবে শ্যামনগর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপকূলীয় সংকট নিরসনে চলমান কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

উপকূলবাসীর প্রশ্ন, আইলার ১৭ বছর পরও যদি নিরাপদ বাঁধ, সুপেয় পানি ও স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত না হয়, তাহলে আগামী দুর্যোগে তাদের রক্ষা করবে কে?

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর