বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬, ঢাকা

সিন্ডিকেটের কবলে রাজারহাটের চামড়া ব্যবসায়ীরা

ইমরান হোসেন পিংকু, যশোর
প্রকাশিত: ২১ মে ২০২৬, ০১:০২ পিএম

শেয়ার করুন:

সিন্ডিকেটের কবলে রাজারহাটের চামড়া ব্যবসায়ীরা
সিন্ডিকেটের কবলে রাজারহাটের চামড়া ব্যবসায়ীরা

যশোরের রাজারহাট, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় চামড়ার মোকাম। পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করেছেন। কিন্তু সিন্ডিকেট, বকেয়া পাওনা, ব্যাংক ঋণ সংকট, লবণ ও উপকরণের দাম বৃদ্ধি এবং শ্রমিক সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছেন তারা। একই সঙ্গে সীমান্ত পথে চামড়া পাচারের আশঙ্কাও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজারহাটে ছোট-বড় মিলিয়ে তিন শতাধিক চামড়ার আড়ত রয়েছে। প্রতি শনি ও মঙ্গলবার বসে এ হাট। খুলনা বিভাগের ১০ জেলা ছাড়াও ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা, নাটোর ও ঢাকার ব্যবসায়ীরা এখানে চামড়া কেনাবেচা করেন। এই মোকামকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় পাঁচ হাজার ছোট-বড় ব্যবসায়ী জীবিকা নির্বাহ করেন। ঈদ-পরবর্তী সময়ে এখানে প্রায় শত কোটি টাকার চামড়া হাতবদল হয়।


বিজ্ঞাপন


তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতি বছর সরকার চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও কার্যকর মনিটরিং না থাকায় মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীরা কাঙ্ক্ষিত মূল্য পান না। ফলে লোকসানের ঝুঁকি বাড়ছে।

সরকার এ বছর ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করেছে। গত বছর যা ছিল যথাক্রমে ৬০-৬৫ ও ৫৫-৬০ টাকা।

বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সহসভাপতি সাঈদ আহমেদ নাসির শেফার্ড বলেন, সরকার দাম নির্ধারণ করলেও সিন্ডিকেটের কারণে মাঠপর্যায়ে সেই দাম কার্যকর হয় না। এতে ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ঢাকার পাইকার ও ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে ঈদের পর হাটে প্রতি বর্গফুট চামড়া ৪০ থেকে ৫০ টাকার বেশি দামে বিক্রি করা যায় না। অথচ সরকারি দামের ভিত্তিতে চামড়া কিনতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হয় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের।


বিজ্ঞাপন


রাজারহাটের আড়তদার আবদুল মালেক জানান, ঢাকার ট্যানারি মালিক ও বড় ব্যবসায়ীদের কাছে এ অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের অন্তত ৩০ কোটি টাকার পাওনা আটকে আছে। দীর্ঘদিনেও সেই টাকা পরিশোধ না হওয়ায় পুঁজি সংকটে পড়েছেন তারা।

তিনি বলেন, ঈদের আগে পাওনা আদায় না হলে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে। আবার স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ঋণও দেওয়া হয় না।

ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদের আগে লবণের দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও প্রতি বস্তা লবণ ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা বেড়ে এক হাজার ৫০ টাকায় পৌঁছেছে। পাশাপাশি শ্রমিক সংকট ও বাড়তি মজুরিও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

স্থানীয় একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, একটি কাঁচা চামড়ায় লবণ, শ্রমিক মজুরি ও পরিবহন খরচ মিলিয়ে অতিরিক্ত ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা ব্যয় হয়। ফলে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় চামড়া কিনলে মোট খরচ দাঁড়ায় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। কিন্তু ট্যানারি মালিকরা সেই দামে চামড়া কিনতে রাজি না হলে লোকসান গুনতে হবে।

রাজারহাটের চামড়া ব্যবসায়ী ও সাবেক ইজারাদার হাসানুজ্জামান হাসু বলেন, প্রতি ঈদের আগে লবণের দাম বেড়ে যায়। এবারও একই ঘটনা ঘটেছে। সরকার ট্যানারি মালিকদের বড় অঙ্কের ঋণ দিলেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করে না।

তিনি আরও বলেন, চামড়াশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ইউরোপের বাজার ধরতে হবে। শুধু চীনের ওপর নির্ভরশীল থাকলে হবে না।

অন্যদিকে, সীমান্ত পথে ভারতে চামড়া পাচারের আশঙ্কাও করছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, ভারতে চামড়ার দাম বেশি থাকায় প্রতিবছর ঈদের সময় পাচারের ঝুঁকি বাড়ে।

এ অবস্থায় শার্শা ও বেনাপোল সীমান্তে সতর্কতা জারি করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। প্রশাসনও পাচার রোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে জানা গেছে।

বৃহত্তর যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল বলেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা নেই। ফলে এনজিও বা মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা এনে ব্যবসা করতে হয়। কিন্তু পরে ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না।

তিনি চামড়া পাচার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর ভূমিকার পাশাপাশি ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোগ দাবি করেন।

এ বিষয়ে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে লবণের কোনো সংকট যেন না হয় সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চামড়া পাচার রোধেও প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

প্রতিনিধি/টিবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর