নেত্রকোনার হাওরে ভারী বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের পানিতে বোরোধান পানিতে তলিয়ে গেছে। জমিতে পানি কাদা জমে থাকায় হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এছাড়াও বৈরী আবহাওয়া ও শ্রমিক সংকটের কারণে দ্রুত ধান কেটে ঘরে তুলতে পারছেন না কৃষকরা।
এদিকে, যেসব কৃষক ইতোমধ্যে অতিরিক্ত মজুরি দিয়ে ধান কেটে স্তূপ করে রেখেছেন, রোদ না থাকায় স্তূপেই পঁচে ও অঙ্কুর গজিয়ে নষ্ট হচ্ছে ধান।
বিজ্ঞাপন
জেলার হাওরাঞ্চল খালিয়াজুরী, মদন ও মোহনগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন হাওর ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
অন্যদিকে, জেলার প্রধান প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সোমবার (৪ মে) জেলার কংস, ধনু ও উপদাখালী নদের পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যন্যগুলোর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
মোহনগঞ্জ উপজেলার গাগলাজুর এলাকার কৃষক বাদল মিয়া বলেন, ১৫০০ টাকা রোজে শ্রমিক দিয়ে চার একর জমির ধান কেটে বাড়ির সামনে স্তূপ করে রেখেছি। বৃষ্টির জন্য শুকাতে পারিনি। এখন দেখছি স্তুপের মধ্যে ধানে অঙ্কুর গজাচ্ছে। বাকিগুলো পঁচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আরও কয়েক একর জমির ধান তলিয়ে গেছে। চোখের সামনে কষ্টের ফসল নষ্ট হতে দেখেও কিছু করতে পারছি না।

বিজ্ঞাপন
অপর কৃষক আঙ্গুর মিয়া বলেন, এখন অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, যাদের ধান তলিয়ে গেছে, তারাই ভাগ্যবান। কারণ অতিরিক্ত মজুরি দিয়ে যারা জমির ধান কেটেছিলেন, তাদের ধান স্তূপেই পঁচে ধ্বংস হয়েছে। তলিয়ে গেলে শুধু ধানই গেল, আর কাটলে ধানের সঙ্গে মজুরিও।
খালিয়াজুরি উপজেলার হায়াতপুর গ্রামের কৃষক নারায়ণ সরকার বলেন, ধান কাটানোর শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। তলিয়ে যাওয়া ধান খেতের মধ্যেই পচে যাচ্ছে।
মদন উপজেলায় উচিতপুর এলাকার কৃষক আ. বারেক বলেন, উচিতপুর হাওরে অর্ধেক জমির ধান পানির নিচে। তিন একর জমির ধান কেটে আমতে পেরেছি। তবে রোদের কারণে ধান শুকাতে পারছি না। বাকি দুই একর জমির ধান পানির নিচে।
কলমাকান্দা উপজেলার বরখাপন ইউনিয়নের উদয়পুর গ্রামের কৃষক রমজান আলী বলেন, বৃষ্টির কারণে ধান শুকাতে পারছি না। ধানে অঙ্কুর গজাচ্ছে। চোখের সামনে কস্টের ফসল নষ্ট হচ্ছে।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে জেলার উপদাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ৪৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে, কংস নদের পানি বিপৎসীমার ৬৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে আর ধনু নদের পানি বিপৎসীমার ১২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া সোমেশ্বরী ও মগড়া নদীর পানি নিচ দিয়ে বইছে। তবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন সকাল ১০টার দিকে জানান, কংস ও উব্দাখালি নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপরে আছে। আর ধনু নদের পানি বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদের খালিয়াজুরি পয়েন্টে বিপৎসীমা ৪ দশমিক ১৫ মিটার।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনার ১০ উপজেলায় এবার ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ টন ধান। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়। সরকারি হিসেবে সোমবার পর্যন্ত হাওরে ৭০ শতাংশ খেতের ধান কাটা হয়েছে। পুরো জেলায় এই হার ৩৪ শতাংশ। আর পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে ১১ হাজার ৩২০ হেক্টর জমির ধান।
তবে বাস্তব চিত্রটা ভিন্ন। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাওরাঞ্চলে ফসল এখনও প্রায় ৬০ শতাংশ খেতের ধান কাটা বাকি। আর পানিতে নিমজ্জিত আছে প্রায় সাড়ে ২৩ হাজার হেক্টর খেতের ধান।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার ডিজেল–সংকটের কারণে কৃষকেরা হার্ভেস্টার দিয়ে সহজে ধান কটতে পারেননি। অন্যান্য বছর কৃষকেরা কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, পাবনা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ধান কাটার শ্রমিক আনতেন। তারা হাওরে জিরাতি হয়ে ধান কাটতেন। কিন্তু হার্ভেস্টারের ওপর নির্ভরশীল থাকায় এখন শ্রমিক আনা হয় না। আর খেতে পানি জমলে ধানকাটার যন্ত্রটি ব্যবহার করা যায়নি। এছাড়া হাওরে অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে বৃষ্টির পানি যেতে পারছে না। পানি যাওয়ার পথগুলো পলি জমে বন্ধ হয়ে গেছে। হাওরের অধিকাংশ জলকপাট (স্লুইসগেট) অকেজো হয়ে রয়েছে।
স্থানীয় হাওর গবেষক সঞ্জয় সরকার বলেন, হাওর নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে পরিকল্পনা না করে টেকসই ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রয়োজন। এর জন্য মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। তলদেশ খনন, কিছু স্থানে স্থায়ী বাঁধ, স্লুইসগেট নির্মাণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ প্রয়োজন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত ১১ হাজার ৩২০ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। তারমধ্যে কিছু জমির ধান কাটা যাবে। আর কিছু জমির ধান নষ্ট হবে।
প্রতিনিধি/টিবি




