মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

নেত্রকোনায় তলিয়ে যাচ্ছে হাওরের ধান, দ্রুত কাটতে প্রশাসনের মাইকিং

জেলা প্রতিনিধি, নেত্রকোনা
প্রকাশিত: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৪ পিএম

শেয়ার করুন:

নেত্রকোনায় তলিয়ে যাচ্ছে হাওরের ধান, দ্রুত কাটতে প্রশাসনের মাইকিং
খালিয়াজুরী উপজেলার চুনাই হাওরে ধান কাটছেন কৃষকরা। ধান কাটতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং। 

ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার ধনু, কংস, সোমেশ্বরী, ভুগাই, উপদাখালীসহ সবগুলো নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। গত কয়েকদিনের মাঝারি ও ভারী বৃষ্টিতে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে হাওরের একমাত্র ফসল বোরো ধান নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। 

এছাড়া ধান কাটা যন্ত্রের জ্বালানি সংকট, শ্রমিক সংকটসহ নানা সমস্যায় যথা সময়ে পাকা ধান কেটে ঘরে তুলতে পারছেন না কৃষকরা। সব মিলিয়ে ফসল নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। তাদের আশঙ্কা, এভাবে পানি বাড়তে অকালবন্যায় ফসল তলিয়ে যেতে পারে।


বিজ্ঞাপন


গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার দুর্গাপুরে ৬৬ মিলি মিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যার আশঙ্কায় দ্রুত হাওরের ফসল কেটে ঘরে তুলতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত দুই দিন ধরে মাইকিং করা হচ্ছে। 

স্থানীয় কৃষক, জেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনার খালিয়াজুরী, মোহনগঞ্জ, মদন ও কলমাকান্দার অধিকাংশ  এলাকা মূলত হাওরাঞ্চল। হাওরের একমাত্র ফসল বোরোর ওপরই নির্ভর করে কৃষকদের সারা বছরের সংসার খরচ, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা ও সামাজিক অনুষ্ঠান। জেলায় ছোট-বড় মোট ১৩৪টি হাওর রয়েছে। আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষায় এ বছর ১৩৮ কিলোমিটার ডুবন্ত (অস্থায়ী) বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। পাউবো ও উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এসব বাঁধ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৩১ কোটি টাকা। এসব বাঁধের ওপর প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল নির্ভরশীল। কিন্তু গত কয়েক দিনে নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেটসহ ভারতের চেরাপুঞ্জি এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি বাড়ছে।

গত সোমবার সকাল থেকে আজ মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিকেল তিনটা পর্যন্ত খালিয়াজুীর ধনু নদে প্রায় চার ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া কংস ও সোমেশ্বরী নদীতেও পানি বেড়েছে।

b1b5641a-da92-460b-90a9-2606eb1d5eb4


বিজ্ঞাপন


হাওরের কৃষক ও কৃষি দফতর সূত্রে জানা গেছে, হাওরের সব খেতের ধান এখন পেকে গেছে। তবে অধিকাংশ খেতে পানি জমে যাওয়ায় ধান কাটার যন্ত্র চালানো সম্ভব হচ্ছে না। শ্রমিক–সংকটও রয়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাত থাকায় কৃষকেরা মাঠে নামতে ভয় পাচ্ছেন। গতকাল খালিয়াজুরীতে বজ্রপাতে তিনজন নিহত হন। ধনু নদে পানি বাড়ায় খালিয়াজুরীর চুনাই হাওর, বাইদ্যার চর, কাটকাইলেরকান্দা, নন্দের পেটনা, কীর্তনখোলাসহ বেশ কয়েকটি হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাছে পানি চলে এসেছে।

খালিয়াজুরির জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম বলেন,  গত কয়েকদিনের  ভারী বৃষ্টিপাতে ধনু নদের পানি অব্যাহতভাবে বাড়ছে। সবকয়টি হাওরের নিচু স্থানে পানি জমে ধান তলিয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে আমরা আতঙ্কে আছি। হাওরে এখনো ৫৮ শতাংশ জমির ধান কাটার বাকি।

লেপসিয়া এলাকার কৃষক রায়হান মিয়া বলেন, ধান খেতে পানি জমে আছে, কাটাতে পারছি না। প্রতি শ্রমিকের রোজ দিতে হয় ১ হাজার ২০০ টাকার উপরে। তারপরও ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। খেতে পানি থাকায় হারভেস্টার মেশি দিয়েও কাটা যায় না। যুদ্ধ করে শেষমেশ  এবার ধান ঘরে তুলতে পারলেও খরচে পোষাবে না। উল্টো লেকশান হবে। আর পানিতে ডুবলে তো সবই শেষ। 

148aa5ca-37ef-4e9a-875f-b9c12a7ca11a

মোহনগঞ্জ উপজেলা গাগলাজুর গ্রামের কৃষক হাফিজুর রহমান বলেন, ভারী বৃষ্টিতে খেতে ধানের শীষ পর্যন্ত পানি জমেছে। শ্রমিকের অভাবে কাটাতে পারছি না। তিনগুণ মজুরি দিয়ে শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ঋণ করে জমিতে বোরোধান রোপন করেছি। ফসল ঘরে তুলতে না পারলে পথে বসা ছাড়া উপায় নেই। আমাদের কি হবে আল্লাহ জানেন। 

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ধনু নদের খালিয়াজুরী পয়েন্টে বিপৎসীমা ৩ দশমিক ৫৭ সেন্টিমিটার। কিন্তু সেখানে এখন পর্যন্ত বিপৎসীমার ৫৮ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। আর সবগুলো ফসলরক্ষা বাঁধ ঠিক আছে। তবে আজ থেকে আরও পানি বাড়বে, এতে বন্যার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তাই বাঁধ হুমকির মুখে পড়বে। উপজেলা প্রশাসনকে নিয়ে আমরা এলাকায় অবস্থান করছি। ফসলরক্ষা বাঁধ রক্ষায় আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।

69e480ca-4e5b-4ffe-94c2-8532b7b75549

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ মেট্রিক টন ধান। এর মধ্যে হাওর অঞ্চলে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৯০ মেট্রিক টন। এখন পর্যন্ত ৫৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ধনু নদসহ সবগুলো নদ-নদীর পানি কিছুটা বেড়েছে তবে এখনো হাওর নিরাপদ আছে। কৃষকেরা যাতে নির্বিঘ্নে ফসল কাটতে পারেন, সে জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাশাপাশি আমরা বাঁধের পিআইসি কমিটির সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলেছি। আমাদের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা মাঠে আছেন। তাদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যেখানে জিও ব্যাগ ফেলার দরকার, সেখানে তা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পানি বাড়লে ঝুঁকি বাড়বে, সে ক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর