শরীয়তপুরের নড়িয়ায় আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি দীর্ঘদিন ধরে আইনি জটিলতায় আটকে থাকায় চালু করা সম্ভব হয়নি। আর এই অচলাবস্থার সুযোগ নিয়ে অরক্ষিত ভবনে একের পর এক চুরির ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ তালা ভেঙে জেনারেটরের কয়েল, এসি ও অন্যান্য যন্ত্রাংশসহ অন্তত ৩৫ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়েছে একটি চক্র। এতে মোট ক্ষতির পরিমাণ অর্ধকোটি টাকার কাছাকাছি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ জানায়, স্বাস্থ্য অধিদফতরের আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে নড়িয়া পৌরসভার বৈশাখীপাড়া এলাকায় আধুনিক এই হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরু হয়। চারতলা বিশিষ্ট মূল ভবনের পাশাপাশি চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য আলাদা কোয়ার্টারসহ মোট পাঁচটি ভবন নির্মাণ করা হয়। হাসপাতালে রোগীদের জন্য আধুনিক চিকিৎসা সুবিধার পাশাপাশি ৫টি আইসিইউ বেডও রাখা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সবকিছু প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত উদ্বোধন আর হয়নি। মুলফৎগঞ্জ এলাকা থেকে পুরোনো হাসপাতালের কার্যক্রম স্থানান্তরের বিরোধিতা করে স্থানীয় একটি পক্ষ আদালতে গেলে শুরু হয় আইনি জটিলতা। এরপর দুই বছরেও তা আর কাটেনি। সর্বশেষ ২০২৬ সালে নির্বাচিত স্থানীয় সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান কিরণ হাসপাতালটি চালুর আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নড়িয়ার পুরোনো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি কেদারপুর ইউনিয়নের মুলফৎগঞ্জ এলাকায় পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। ২০১৮ সালে ভয়াবহ নদীভাঙনে তিনতলা ভবনটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। পরে বাধ্য হয়ে হাসপাতালের কার্যক্রম পাশের সরকারি কোয়ার্টার ও একটি পরিত্যক্ত ভবনে চালু রাখা হয়। জায়গা সংকটের কারণে ৫০ শয্যার বিপরীতে বর্তমানে মাত্র ২৫টি শয্যায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এক্স-রে মেশিন থাকলেও কক্ষের অভাবে তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। প্যাথলজি ও অপারেশন থিয়েটারও চলছে সীমিত পরিসরে।
এদিকে নতুন হাসপাতালটি হস্তান্তর না হওয়ায় দীর্ঘদিন অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। প্রথমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখলেও জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেখানে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। নির্বাচন শেষে সেনা সদস্যরা চলে গেলে ভবনটি পুরোপুরি নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে।

এই সুযোগে গত শুক্রবার রাতে একটি চক্র হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষের তালা ভেঙে জেনারেটরের কয়েল, তিনটি এসি ও অন্যান্য মূল্যবান সরঞ্জাম নিয়ে যায়। এতে প্রায় সাড়ে ৩৪ লাখ টাকার সরাসরি ক্ষতি হলেও সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণ অর্ধকোটি টাকার বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। বাসিন্দা আলমগীর হাওলাদার বলেন, আইসিইউসহ এত আধুনিক একটি হাসপাতাল থাকলেও চালু না হওয়ায় মানুষ চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এখন আবার লাখ লাখ টাকার মালামাল চুরি হয়ে যাচ্ছে। এর দায়িত্ব কে নেবে?
আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ আলম শেখ বলেন, হাসপাতাল চালু না থাকায় রোগীদের নিয়ে জেলা শহর বা ঢাকায় যেতে হয়। সময়মতো চালু হলে এই চুরির ঘটনাও ঘটত না। আমরা দ্রুত আইনি জটিলতা নিরসন করে হাসপাতাল চালুর দাবি জানাই।

সচেতন মহলও এ ঘটনায় কর্তৃপক্ষের গাফিলতির অভিযোগ তুলেছে। তাদের মতে, দায়িত্বহীনতার কারণেই সরকারি সম্পদের এমন ক্ষতি হচ্ছে।
নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাহার মিয়া জানান, হাসপাতালটি দীর্ঘদিন অরক্ষিত ছিল। তালা ভাঙার খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে চুরির বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে জেলা সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন বলেন, হাসপাতালটি এখনো আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। তাই এর দায়িত্ব স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী আহসান হাবীবের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে খুদে বার্তায় তিনি দাবি করেন, চুরির ক্ষতির পরিমাণ ৩৪ লাখ ৫ হাজার টাকা এবং হস্তান্তর না হওয়ায় দায়ভার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল কাইয়ুম খান বলেন, হাসপাতালটি এখনো হস্তান্তর না হওয়ায় স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের দায়িত্বে রয়েছে। ইতোমধ্যে এ ঘটনায় জিডি করা হয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা, প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাব ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে কোটি টাকার এই প্রকল্পটি এখন কার্যত অচল। দ্রুত সমাধান না হলে একদিকে যেমন জনসেবা থেকে বঞ্চিত হবে মানুষ, অন্যদিকে সরকারি সম্পদের ক্ষতির অঙ্ক আরও বাড়বে—এমন আশঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিনিধি/এসএস




