রোববার, ৩ মে, ২০২৬, ঢাকা

‘পানির নিচ থেকে ধান কেটে কী করব’—হাওরে কৃষকের আর্তনাদ

আশিকুর রহমান মিঠু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশিত: ০৩ মে ২০২৬, ০৮:৩৪ পিএম

শেয়ার করুন:

‘পানির নিচ থেকে ধান কেটে কী করব’—হাওরে কৃষকের আর্তনাদ
বন্যায় তলিয়ে গেছে হাওরের ধান। কৃষকদের হাহাকার। ছবি: ঢাকা মেইল

পানির নিচ থেকে ধান কেটে এনে কী করব, তাই জমির দিকে তাকিয়ে থাকি— কথাগুলো বলছিলেন কৃষক নারায়ন দাস। কণ্ঠে হতাশা, চোখে নিঃশব্দ ক্ষোভ। নাসিরনগরের মেদির হাওরে তাঁর চার কানি জমির আধাপাকা ধান এখন থইথই পানির নিচে। কেবল তাঁরই নয়, পুরো এলাকার কৃষকের স্বপ্নের সোনালি ফসল এখন ডুবে আছে অকাল বন্যার পানিতে।

আর দুই সপ্তাহ সময় পেলেই ফসল ঘরে তোলা যেত—এমন আশা ছিল কৃষকের। কিন্তু উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল সেই স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে। ধান কাটার আগমুহূর্তে হঠাৎ পানি ঢুকে পড়ায় মাঠজুড়ে এখন নিস্তব্ধতা।


বিজ্ঞাপন


নাসিরনগর উপজেলার হাওরাঞ্চলে প্রায় তিন হাজার বিঘা জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে বলে স্থানীয় কৃষকেরা জানান। কোথাও কোথাও শ্রমিক দিয়ে আধাপাকা ধান কেটে তোলার চেষ্টা চলছে। তবে সেই চেষ্টাও ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ।

স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, পানির নিচ থেকে ধান কেটে আনার খরচই এখন কৃষকের মাথাব্যথার কারণ। এক মণ ধানের বাজারমূল্য যেখানে প্রায় ৬০০ টাকা, সেখানে একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।

Hour5

শ্রীপুর গ্রামের কৃষক নারায়ন দাস বলেন, ‘পানির নিচ থেকে কেটে আনা ধানের দাম যা পাই, তার চেয়ে শ্রমিক খরচই বেশি। তাই জমির দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই। পানি যদি একটু কমে, কিছু ধান হয়তো বাঁচানো যাবে।’


বিজ্ঞাপন


তিনি জানান, তিনি বিআর-২৯ জাতের ধান চাষ করেছিলেন চার কানি জমিতে। ফসল ঘরে তোলার আগেই অকাল বন্যা সব তলিয়ে দিয়েছে।

একই অবস্থা চক্কু মিয়ারও। তিনি ২০ কানি জমিতে ধান রোপণ করেছিলেন। এর মধ্যে মাত্র পাঁচ কানি ধান কেটে আনতে পেরেছেন। বাকি জমির ফসল এখনো পানির নিচে।

আরও পড়ুন: হাওর সমস্যার টেকসই সমাধানে বাপার ১৬ দফা সুপারিশ

নাসিরনগর পশ্চিম পাড়ার কৃষক বাবুল মিয়া বলেন, তাঁর ২০ বিঘা জমির ধানই এখন পানির নিচে। তিনি বলেন, ‘শ্রমিকের মজুরি বেশি, পানির চাপও বেশি। কৃষি বিভাগের কাউকে পাশে পাইনি। জনপ্রতিনিধিরাও খোঁজ নেয়নি।’

এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপপরিচালক ড. মোস্তফা এমরান হোসেন জানান, উজানের ঢলে জেলার হাওরাঞ্চলের প্রায় ৩০ শতাংশ জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, এ বছর জেলায় ১ লাখ ১১ হাজার ৭৭০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। নতুন জাতের কারণে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা থাকলেও অকাল বন্যার প্রভাব কতটা হবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।

Hour3

অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. নূর আলী জানান, সরকার এ বছর ৩৬ টাকা কেজি দরে ১১ হাজার ৫৫ মেট্রিক টন ধান কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ক্রয় করবে।

কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ৪ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা।

হাওরের বুকজুড়ে এখন শুধু পানি আর নীরবতা। তার ভেতরেই দাঁড়িয়ে আছেন নারায়ন দাস, চক্কু মিয়া, বাবুল মিয়াদের মতো শত শত কৃষক—যাদের চোখে এখন শুধু আকাশ আর ডুবে থাকা ধানের দিকে নিঃশব্দ তাকিয়ে থাকা।

এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর