হাওর অঞ্চলের চলমান বন্যা, জলাবদ্ধতা ও ফসলহানির প্রেক্ষাপটে টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে ১৬ দফা সুপারিশ তুলে ধরেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)। সংগঠনটি জানায়, হাওরের সংকট কেবল প্রাকৃতিক নয়; বরং নীতিগত, পরিকল্পনাগত ও ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার ফল।
রোববার (৩ মে) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের মওলানা জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘হাওর অঞ্চলে চলমান বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ফসলহানি, দুর্যোগ পরিস্থিতি এবং হাওরবাসীর দাবি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বাপা’র সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার এবং সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির কোষাধ্যক্ষ আমিনুর রসুল। লিখিত প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি অধ্যাপক কাসমির রেজা।
বিজ্ঞাপন
লিখিত প্রবন্ধে অধ্যাপক কাসমির রেজা বলেন, দেশের মোট উৎপাদিত ধানের প্রায় ২০ ভাগ আসে হাওর থেকে। তাই হাওরে ফসলহানি হলে সারাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং খাদ্য অধিকারকে তা প্রভাবিত করে। বর্তমান দেশীয় ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় যা খুব উদ্বেগজনক। চলতি বোরো মৌসুমে মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু করে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত তিন দফা বৃষ্টিপাত এবং কয়েকটি হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ফলে হাওরের অন্তত ৭৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া শিলাবৃষ্টিতে আরো প্রায় ৮০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনো হাওর অঞ্চল এবং মেঘালয়ের পাহাড়ে বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
হাওর অঞ্চলের মানুষের একমাত্র জীবিকার ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। যে ধান নিয়ে কৃষক সারা বছরের খরচ মেটানোর বা ধারদেনা মেটানোর স্বপ্ন দেখছিলেন, সেই ধান চোখের সামনে পানিতে ভাসছে কিংবা কাটার পরও রক্ষা করা যাচ্ছে না। এই দৃশ্য দেখে কৃষকের মনে যে বোবা কান্না জমে উঠেছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
এ বছর বেশির ভাগ ফসল নষ্ট হয়েছে জলাবদ্ধতায়। এমন জলাবদ্ধতা হাওরবাসী আগে দেখেননি। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, অপরিকল্পিত বাঁধ/রাস্তা নির্মাণ এর জন্য প্রধানত দায়ী। কোনো বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা বা গবেষণা ছাড়া বাঁধ/রাস্তা নির্মাণ, ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজে বিলম্ব এবং ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি ফসল রক্ষা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। প্রতি বছরের মতো এবারও হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নিয়ে সীমাহীন অনিয়ম হয়েছে। ফেব্রুয়ারির নির্ধারিত সময় পেরিয়ে মার্চ-এপ্রিলেও অনেক বাঁধের কাজ অসম্পূর্ণ ছিল। আমরা আগেই বিভিন্নভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছিলাম, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তিনি আরো বলেন, হাওরের সমস্যাকে শুধুমাত্র একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। এটি একটি নীতিগত, পরিকল্পনাগত এবং ব্যবস্থাপনাগত সংকট। আমরা মনে করি হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা এখন সময়ের দাবি। স্থানীয় কৃষকদের অভিজ্ঞতা এবং গবেষকদের কারিগরি জ্ঞান একত্রিত করে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
বিজ্ঞাপন
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, হাওরে প্রতি বছর বন্যা এবং ব্যাপক ফসলহানি হয়ে থাকে। সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়, কিন্তু কাজের কাজ হয় না। ফসল হারিয়ে অনেক কৃষক হার্টফেল করে মারা যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। প্রতি বছর হাওরের ফসল ক্ষতি থেকে রক্ষা করার জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে, কিন্তু বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না কেন— সে বিষয়ে ভাবতে হবে।
তিনি আরো বলেন, সরকারি সংশ্লিষ্ট অধিদফতর ও মন্ত্রণালয় এবং প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের পকেট ভারী করার জন্য মিলেমিশে একাকার। তারা হাওরের জনসাধারণের টেকসই উন্নয়নের কথা কখনও ভাবেননি।
শামসুল হুদা বলেন, প্রতিবার হাওরের সমস্যাকে প্রাকৃতিক সমস্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু হাওরের এ সমস্যা মানবসৃষ্ট। হাওরে রাস্তা নির্মাণ, বাঁধ নির্মাণ করে তার স্বাভাবিক গতিকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে, যার কারণে আগাম বন্যাসহ অন্যান্য সমস্যাগুলো তৈরি হচ্ছে। প্রয়োজনে রাস্তা কেটে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবি জানাই। হাওরের জলাধার নিয়ে লিজ বাণিজ্য হয়ে থাকে, সেটা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ভূমিহীন কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন, তাদের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাই।
হাওর বোর্ডের গাফিলতি রয়েছে উল্লেখ করে বলেন, তারা আগাম প্রস্তুতি সঠিকভাবে নেয় না। তিনটি জেলা সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ এবং নেত্রকোণা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যা হলে ধান কাটতে নৌকার প্রয়োজন হয়, কিন্তু নৌকার অভাব রয়েছে। কৃষি শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না— সেটা আরেক সমস্যা কৃষকের জন্য। আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ, কৃষকদের ভর্তুকি দেওয়ার দাবি জানাই। বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমিক হাওর অঞ্চলে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত, তাদের সমস্যা চিহ্নিত করে কাজের শোভন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, হাওরে সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা কাজ করছে, তবে ব্যবস্থাপনা ক্ষেত্রে আরো কাজ করার সুযোগ রয়েছে। হাওরের বন্যা কৃষি ব্যবস্থাপনাকে সংকটের মুখে ফেলেছে। পূর্বে কৃষিতে তেভাগা পদ্ধতি ছিল, তখন ফসলহানি হলে জমির মালিকও ক্ষতিগ্রস্ত হতো। কিন্তু বর্তমানে জমির লিজ ব্যবস্থার কারণে জমির মালিক বর্গাচাষিদের কাছ থেকে ফসল ফলানোর আগেই টাকা নিয়ে নেয়; ফলে ফসল ক্ষতি হলে সেটি সম্পূর্ণরূপে কৃষকের ক্ষতি হয়। হাওর অঞ্চলে অভাবের কারণে স্কুল থেকে শিশুরা ঝরে পড়ে এবং বাল্যবিবাহ বেড়ে যায়। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, হাওরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হয়, কিন্তু সেই ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করতে ক্ষমতাসীন দলের মানুষ এগিয়ে আসে। এবার যেন সর্বদলীয় মানুষ মিলে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখে।
আমিনুর রসুল বলেন, কোরবানির পশুর একটি বিরাট অংশ হাওর অঞ্চল থেকে আসে। সাম্প্রতিক বন্যায় সেই সব এলাকার প্রস্তুতকৃত গবাদি পশুগুলো রাখার জায়গা এবং খাদ্যের অভাবে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন চাষিরা। জলবায়ু তহবিল থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, হাওর অঞ্চলের মানুষের জন্য বন্যার সংকেত ব্যবস্থা প্রচলন করতে হবে। হাওরে স্লুইস গেট নির্মাণ অবিলম্বে বন্ধ করে হাওরের পানির প্রবাহ বহমান রাখতে হবে। হাওরের প্রাণপ্রকৃতি রক্ষার জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক মহাপরিকল্পনা নিতে হবে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক যেন ক্ষতিপূরণ পায়, তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাই।
এই বাস্তবতায় সরকারের সংশ্লিষ্ট সকল মহলের কাছে ১৬ দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়—
১. অকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত কৃষকদের জন্য বছরব্যাপী আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
২. হাওরে নদী, খাল ও বিল পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ব্যাপকভাবে খনন করে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
৩. হাওরের মাঝ দিয়ে অপরিকল্পিত সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করতে হবে।
৪. ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. হাওর সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
৬. হাওরের জলাবদ্ধতা নিরসনে হাওরের ছড়িয়ে থাকা স্লুইচগেট অপসারণ ও নতুন করে স্লুইচগেট নির্মাণ বন্ধ করতে হবে।
৭. চলতি বোরো মৌসুমে হাওরের কৃষকদের মাঝে যারা ধান তুলতে পেরেছেন তাদের কাছ থেকে সরকারকে অন্তত দশ লাখ টন ধান (চাল নয়) কিনতে হবে।
৮. ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে সহজ শর্তে সুদমুক্ত কর্মসংস্থান ঋণ দিতে হবে। বর্তমানে কোনো ঋণ থাকলে তা পুনরায় তফসিল করতে হবে।
৯. হাওরে ধান মাড়াইয়ের জন্য বজ্রনিরোধকসহ উচু করে কমিউনিটি মাড়াই কেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে।
১০. ভেজা ধান দ্রুত শুকানোর জন্য প্রতিটি হাওরে সরকারি খরচে ড্রায়ারের ব্যবস্থা করতে হবে।
১১. হাওরে বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে গাছ কাটা বন্ধসহ বিজ্ঞানসম্মত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
১২. হাওরের জলমহালগুলো লিজ না দিয়ে হাওরবাসীর জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে।
১৩. হাওর অঞ্চলে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
১৪. পরবর্তী ফসল না ওঠা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ৩০ কেজি চাল ও এক হাজার টাকা করে আর্থিক সাহায্য প্রদান করা।
১৫. জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডসহ বিভিন্ন জলবায়ু তহবিল থেকে হাওর বিষয়ক গবেষণা ও পরিবেশ সহায়ক প্রকল্প গ্রহণ করে হাওরের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বরাদ্দ নিশ্চিত করা।
১৬. সরকারি খরচে ধান মাড়াই ও শুকানোর জন্য উঁচু স্থানে কমিউনিটি খামার তৈরি করতে হবে।
এই আয়োজনে আরো বক্তব্য রাখেন বাপা’র যুগ্ম সম্পাদক ড. হালিমদাদ খান, নির্বাহী সদস্য হাফিজুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট পারভীন আক্তার, হাজী শেখ আনসার আলী, বাপা’র জীবন সদস্য ড. হারুন অর রশিদ, ফরিদ হাসান, সাবেক অতিরিক্ত সচিব উমর খইয়াম প্রমুখ।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন বাপা’র নির্বাহী সদস্য তিতলি নাজনিন, জাতীয় পরিষদ সদস্য নাজিম উদ্দিনসহ আয়োজক সংগঠনসমূহের অন্যান্য প্রতিনিধিবৃন্দ।
এএইচ/এফএ




