দেশের চারদিকে এখন শুধুই শিশুদের কান্নার শব্দ। কোথাও তীব্র জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে, আবার কোথাও শরীর জুড়ে লালচে দানার যন্ত্রণায় ছটফট করছে ছোট ছোট শিশুরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, দেশের ৬১টি জেলাতেই হাম ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, একে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ বলা হচ্ছে। অথচ এই ঘোর বিপদের মধ্যেও খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলা যেন আশার আলো দেখাচ্ছে। সমতলের হাসপাতালগুলোতে যখন রোগীদের ভিড়ে জায়গা নেই, তখন পাহাড়ের কার্যকর টিকাদান কর্মসূচি সবাইকে নতুন পথ দেখাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
পাহাড়ের এই সাফল্যের পেছনে প্রধান দুটি কারণ হলো প্রয়োজনীয় টিকার পর্যাপ্ত মজুদ এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের কঠোর পরিশ্রম।
খাগড়াছড়ি জেলার চিত্র এখন পর্যন্ত বেশ স্বস্তিদায়ক। সেখানকার সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ছাবের জানান, জেলায় প্রায় ৭৯ হাজার ৪৩২ জন শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। এখানকার ১ হাজার ৫১৯টি কেন্দ্রের মধ্যে অনেকগুলোই পাহাড়ের এমন গভীরে যে সেখানে পৌঁছানো খুবই কঠিন। কিন্তু স্বাস্থ্যকর্মীরা টিকার বক্স হাতে সেই দুর্গম পথ পাড়ি দিচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, পরীক্ষার জন্য ১৩ জন শিশুর নমুনা ঢাকায় পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত কেউ পজিটিভ শনাক্ত হয়নি। মোহাম্মদ ছাবেরের মতে, দ্রুত চিকিৎসা করালে ৯৫ শতাংশ শিশু সুস্থ হয়ে যায়, তবে কম ওজনের শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগ বিপজ্জনক হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
রাঙামাটি জেলার অবস্থাও অনেকটা একই রকম। সেখানকার সিভিল সার্জন ডা. নূয়েন খীসা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই তারা জনসংখ্যার অনুপাতে সঠিক পরিমাণে টিকা সংগ্রহ করেছিলেন এবং তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করেছেন। যেখানে সমতলে টিকার সংকট দেখা দিয়েছে, সেখানে রাঙামাটিতে পর্যাপ্ত মজুদ থাকায় লক্ষ্যমাত্রার ৩০ শতাংশের বেশি শিশুকে এরই মধ্যে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। রাঙামাটি সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক শওকত আকবর জানান, তাদের জেলায় এখন পর্যন্ত কোনো শিশু হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রমাণ মেলেনি।
পাহাড়ের এই স্বস্তির খবর স্থানীয়দের মনেও আশা জাগিয়েছে। রাঙামাটির বনরূপা এলাকার ব্যবসায়ী ও অভিভাবক মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, জেলা এখন পর্যন্ত আক্রান্তমুক্ত থাকলেও উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। তবে সরকারের টিকাদান কার্যক্রম নিয়মিত চললে শিশুদের ঝুঁকি কমবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমতলে টিকার সংকট এবং নিয়মিত টিকাদানে অবহেলার কারণেই সংক্রমণ এত দ্রুত ছড়িয়েছে। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, সঠিক সময়ে সঠিক পরিকল্পনা থাকলে যেকোনো মহামারি ঠেকানো সম্ভব। একদিকে সমতলের মায়েরা যখন তাদের অসুস্থ সন্তান নিয়ে হাসপাতালের বারান্দায় টিকার জন্য হাহাকার করছেন, ঠিক অন্যদিকে পাহাড়ের চূড়ায় শিশুরা টিকার সুরক্ষায় নিরাপদ থাকছে। সদিচ্ছা আর সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে এই মহামারিকে যে আটকে রাখা সম্ভব, পাহাড়ের এই জয় সেই শিক্ষাই দিচ্ছে।
প্রতিনিধি/একেবি




