অপারেটর নিয়োগের জটিলতায় প্রায় দুই বছর ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে ৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকার সিংগেল পয়েন্ট মোরিং (এসপিএম) প্রকল্প। অথচ এই অত্যাধুনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে যেখানে প্রচলিত পদ্ধতিতে এক লাখ টন তেল খালাসে সময় লাগে অন্তত ১১ দিন, সেখানে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় একই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব। এতে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা থাকলেও সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ।
জ্বালানি সংকটের এই অস্থির সময়ে কক্সবাজারের মহেশখালীতে নির্মিত এসপিএম প্রকল্পটি সাগর থেকে সরাসরি ডিপোতে জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু নির্মাণ শেষ হওয়ার প্রায় দুই বছর পরও প্রকল্পটি চালু না হওয়ায় এর পূর্ণ সুফল মিলছে না।
বিজ্ঞাপন
এসপিএম হলো গভীর সমুদ্র থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল খালাস, পরিবহন ও মজুদের একটি আধুনিক ব্যবস্থা। বঙ্গোপসাগরে নোঙর করা বড় জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পৌঁছাবে মহেশখালীর টার্মিনালে। সেখান থেকে ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনে চট্টগ্রামের শোধনাগারে যাবে তেল, যার মধ্যে ১৪৬ কিলোমিটার সমুদ্রের তলদেশে স্থাপিত।

প্রকল্পটিতে রয়েছে ছয়টি স্টোরেজ ট্যাংক - তিনটিতে মোট ১ লাখ ২৬ হাজার মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল এবং বাকি তিনটিতে ৭৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল মজুদের সক্ষমতা। ডাবল পাইপলাইন ব্যবস্থার কারণে একই সঙ্গে ক্রুড অয়েল ও ডিজেল পরিবহন করা সম্ভব।
পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানির প্ল্যানিং অ্যান্ড অপারেশন বিভাগের ডিজিএম জামান নাহিদ রায়হান বলেন, নিয়মিত আমদানি নিশ্চিত করা গেলে এই প্রকল্প দেশের জ্বালানি পরিবহন কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করবে এবং স্বল্প সময়ে তেল খালাসের মাধ্যমে মজুদ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।
বিজ্ঞাপন
প্রকল্পটির কমিশনিং সম্পন্ন হলেও অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স (ওঅ্যান্ডএম) কন্ট্রাক্টর নিয়োগ না হওয়ায় এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওয়ারেন্টি বা ডিফেক্ট লাইবিলিটি পিরিয়ড শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অসম্পূর্ণ কাজের কারণে তা আরও ছয় মাস বাড়ানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী টেন্ডার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রথম দফার টেন্ডার রেসপন্সিভ না হওয়ায় পুনরায় রি-টেন্ডার আহ্বান করা হয়। বর্তমানে দরপত্র মূল্যায়ন পর্যায়ে রয়েছে এবং সর্বনিম্ন দরদাতা নির্বাচন করা গেলে দ্রুত প্রকল্পটি চালু করা সম্ভব হবে।
কর্তৃপক্ষ আশা করছে, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাকি কাজ শেষ করে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা যাবে এবং চলতি বছরের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হবে।
প্রকল্পটি চালু হলে বছরে প্রায় ৯০ লাখ টন জ্বালানি খালাস ও পরিবহন সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দেশের প্রায় এক মাসের ক্রুড অয়েল এবং এক সপ্তাহের ডিজেল মজুদ রাখা যাবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতায় বড় ধরনের স্বস্তি দিতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ম. তামিম বলেন, এটি একটি সময় ও ব্যয় সাশ্রয়ী প্রকল্প। পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল খালাস করলে ক্ষয়ক্ষতি কমে এবং এটি পরিবেশবান্ধবও।
ড. বদরূল ইমাম বলেন, প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার পরও কেন এটি চালু হয়নি, তা প্রশ্নবিদ্ধ। দ্রুত এটি চালু করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
মহেশখালী-কুতুবদিয়ার সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ফরিদ বলেন, প্রকল্পটি চালু করা গেলে দেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের অবদান রাখবে। বিষয়টি সংসদে তুলে ধরা হবে।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল শুক্কুর বলেন, এসপিএম প্রকল্পটি পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি সাশ্রয়ী একটি আধুনিক উদ্যোগ। এটি চালু হলে সময়, খরচ ও অপচয় কমবে এবং অপারেশনাল দক্ষতা বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, বিপুল বিনিয়োগের এই প্রকল্পটি দ্রুত চালু করা জরুরি। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি দ্রুত সম্পন্ন করা গেলে দেশের জ্বালানি সংকট নিরসনে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
এদিকে, শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকা পরিদর্শনে আসেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এর আগে প্রতিমন্ত্রী জাহাজযোগে সাগরে স্থাপিত এসপিএম বয়া পরিদর্শন করেন। পরে সন্ধ্যা ৬টার দিকে তিনি মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায় পৌঁছান এবং এলএনজি ও এলপিজি টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শন করেন।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে বিপুল অর্থ ব্যয়ে বাস্তবায়িত কিছু প্রকল্প এখনও পূর্ণ সক্ষমতায় চালু না হওয়া উদ্বেগজনক।
প্রতিনিধি/এসএস




