সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

নিঝুম দ্বীপে ইব্রাহিম পার্টির বিরুদ্ধে নদী দখল ও জাল লুটের অভিযোগ

ছায়েদ আহামেদ, হাতিয়া (নোয়াখালী)
প্রকাশিত: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম

শেয়ার করুন:

নিঝুম দ্বীপে ইব্রাহিম পার্টির বিরুদ্ধে নদী দখল ও জাল লুটের অভিযোগ

নোয়াখালীর হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপে বনভূমি, চর ও সি-বিচের জায়গা দখলের পর এবার নদী-খাল দখলের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী ‘ইব্রাহিম পার্টি’র বিরুদ্ধে। তার অনুমতি ছাড়া নদীতে মাছ ধরতে যাওয়ায় জেলেদের জাল লুট, মারধর ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

গত শনিবার (১১ এপ্রিল) দিবাগত রাত সাড়ে ৮টার দিকে চর কবিরা সংলগ্ন নদীতে মাছ ধরতে গেলে ভোলার চরফেশন এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মাঝির আড়াই লাখ টাকার জাল লুটের ঘটনা ঘটে।


বিজ্ঞাপন


ভুক্তভোগী আব্দুল মাঝি জানান, আমরা কোরাল জাল ফেলতে গেলে একদল লোক ইব্রাহিম পার্টির নাম বলে আমাদের জোর করে নদী থেকে তুলে নেয়। পরে ইব্রাহিম পার্টি বলেন—‘চার কবিরা থেকে মনপুরার কালকিনি সীমান্ত পর্যন্ত সব আমার। এখানে মাছ ধরতে হলে আমার কাছ থেকে হার (ফার) ভাড়া নিতে হবে, না হলে নৌকা ছিদ্র করে দেব।’

আব্দুল মাঝি আরও বলেন, হুমকি দিয়ে আমাদের তাড়িয়ে দেওয়ার পর দেখি নদীতে ফেলা আড়াই লাখ টাকার জাল নেই। পরে তার কাছে গেলে প্রথমে অস্বীকার করেন। আমাদের ৮ কেজি ৮০০ গ্রামের একটি কোরাল মাছও নিয়ে যায় তার লোকজন। প্রায় ১০ হাজার টাকার মাছের বিপরীতে মাত্র দুই হাজার টাকা দিয়ে আমাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

4fed0192-8a8a-48f7-878d-4e051908d1f3

এ বিষয়ে ইব্রাহিম পার্টির সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জাল লুটের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জাল আমি নিইনি, নৌপুলিশ নিয়েছে।


বিজ্ঞাপন


তবে নিঝুম দ্বীপ নৌপুলিশ ইনচার্জ আশিক জানান, এ ধরনের কোনো ঘটনার বিষয়ে তিনি অবগত নন।

ঘটনার পর চারদিকে বিষয়টি জানাজানি হলে গতকাল রোববার (১২ এপ্রিল) রাতে লুট হওয়া জালের অর্ধেক ফেরত পাঠানো হয় বলে জানান আব্দুল মাঝি। তবে বাকি জাল ফেরত না পাওয়ায় তিনি অভিযুক্তদের বিচার দাবি করেছেন।

এদিক, এ ঘটনার মধ্যে গতরাতে নিঝুম দ্বীপের নামার বাজারে বিলাসের চা দোকানে স্থানীয় সোহরাব মাঝির ছেলে রাজিবকে মারধর করে ইব্রাহিম পার্টির ভাতিজা ইলিয়াস। ভুক্তভোগী পরিবার জানায়, সাগরে জাল বসানোর ভাড়া না দেওয়ায় এ হামলার ঘটনা ঘটে।

24e3b35d-32d7-497c-b691-e322320ccca5

আরও পড়ুন

হাতিয়া চেয়ারম্যান ও নলচিরা ঘাটে সব অবৈধ টোল আদায় স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অন্তত ১০ জন জেলে জানান, তারা ১০ থেকে ৩০ বছর ধরে নিঝুম দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কিন্তু বর্তমানে ইব্রাহিম পার্টি ও তার ভাই খায়ের পার্টির গ্রুপকে চাঁদা না দিলে নদী বা সাগরে যাওয়া যায় না। প্রতি হার (ফার) বাবদ ৩০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।

জেলেদের অভিযোগ, চাঁদা না দিলে মারধর, জাল কেটে দেওয়া কিংবা নৌকা ডুবিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এছাড়া সাগর থেকে মাছ এনে তাদের গদিতে দিতে বাধ্য করা হয়, কিন্তু সঠিক মূল্য পাওয়া যায় না। ৮০০ টাকার মাছের দাম দেওয়া হয় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, ৫০০ টাকার চিংড়ি দেওয়া হয় মাত্র ৬০ টাকা।

620cdc9b-7d36-43cc-bb19-0589c14f2c0c

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইব্রাহিম পার্টি বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি করে নিঝুম দ্বীপের সি-বিচের উত্তর পাশে শতাধিক দাগ জমি, বনভূমি ও চর এলাকার বিস্তীর্ণ অংশ দখলে নিয়েছেন। নামার বাজারে বিলাসবহুল হোটেলসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

উল্লেখ্য, নিঝুম দ্বীপের তিনদিকে বঙ্গোপসাগর এবং একদিকে মেঘনা নদী বেষ্টিত। এই বিশাল জলাভূমির বিভিন্ন অংশ স্থানীয় প্রভাবশালীরা দখল করে ভাড়া ও বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

দ্বীপটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশই মৎস্যজীবী হলেও প্রভাবশালীদের দখলদারিত্বের কারণে অনেক জেলে এখন বেকার হয়ে পড়েছেন। সমুদ্রে মাছ ধরতে হলে মোটা অংকের ভাড়া দিতে হয়, যা দিতে না পারায় অনেকেই পেশা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।

f860e97b-57bd-4beb-8b20-9ebff9336149

এছাড়া, বন বিভাগের তথ্যমতে, নিঝুম দ্বীপ একটি জাতীয় উদ্যান হলেও প্রায় ২৫ হাজার মানুষের বসবাস থাকায় এটি ইউনিয়ন হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। একইসঙ্গে এলাকাটি ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) এবং আশপাশের সমুদ্র অঞ্চল মেরিন প্রোটেক্টেড এরিয়া (এমপিএ) হিসেবে ঘোষিত। এই আইনি জটিলতাকে কাজে লাগিয়েই প্রভাবশালীরা সাধারণ জেলেদের শোষণ করছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

এ বিষয়ে নৌপুলিশ ইনচার্জ আশিক জানান, ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর