শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

৫ বছরে ২৫০ বেওয়ারিশ লাশ দাফন করল ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’

জেলা প্রতিনিধি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশিত: ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ১১:০৯ পিএম

শেয়ার করুন:

৫ বছরে ২৫০ বেওয়ারিশ লাশ দাফন করল ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’
৫ বছরে ২৫০ বেওয়ারিশ লাশ দাফন করল ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’। ছবি: ঢাকা মেইল

প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরে প্রায় ২৫০টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে এক অজ্ঞাত যুবকের দাফনের মাধ্যমে সংগঠনটি তাদের ২৫০তম দাফন সম্পন্ন করে।

জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে কোনো পরিচয়হীন মরদেহ এলে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. আজহার উদ্দিনকে খবর দেওয়া হয়। পরে সংগঠনের সদস্যরা মরদেহের গোসল, কাফন, জানাজা ও দাফনের সব ব্যবস্থা করেন।


বিজ্ঞাপন


সর্বশেষ দাফন হওয়া যুবকটির বয়স আনুমানিক ৩০ বছর। গত রোববার ভোরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আশুগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরপুর এলাকায় অজ্ঞাত একটি যানবাহনের ধাক্কায় তিনি গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে আশুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়। দীর্ঘ সময়েও স্বজনদের সন্ধান না মেলায় তাঁকে শহরের পূর্ব মেড্ডা তিতাস নদীর পাড়ে অবস্থিত বেওয়ারিশ লাশের কবরস্থানে দাফন করা হয়।

lash

সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. আজহার উদ্দিন জানান, করোনাকালে স্বজনদের দাফনসংক্রান্ত সংকট নিরসনের লক্ষ্যে ২০২০ সালে তিনি প্রথম এ উদ্যোগ নেন। সে সময় অনেক পরিবার ভীতি বা অসহায়ত্বের কারণে প্রিয়জনের দাফনে এগিয়ে আসতে পারত না। পরবর্তীতে ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি ১০ থেকে ১২ জন সদস্য নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’ প্রতিষ্ঠা করা হয়।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে বেওয়ারিশ লাশ দাফন ও অজ্ঞাত রোগীদের সহায়তা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সংগঠনটি। হাসপাতাল বা পুলিশের পক্ষ থেকে অনুরোধ পেলেই তারা দাফনের উদ্যোগ নেয়। ময়নাতদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে পুলিশ মরদেহ হস্তান্তর করলে কাফনের কাপড়, বাঁশ, চাটাইসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করে ইসলামী বিধান অনুযায়ী জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন করা হয়। এসব কার্যক্রমের ব্যয় সংগঠনের প্রধান ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে বহন করেন। পাশাপাশি বিনা মূল্যে রক্তদান, অক্সিজেন সেবা ও অসহায় মানুষের সহায়তায় কাজ করে সংগঠনটি।


বিজ্ঞাপন


lash

তবে বর্ষা মৌসুমে দাফন কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যায় পড়তে হয় সংগঠনের সদস্যদের। কবরস্থানটি নিচু হওয়ায় বৃষ্টির সময় সেখানে পানি জমে কবর ডুবে যায়। কবরস্থানটি মাটি ভরাট ও সংস্কারের জন্য জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার কাছে একাধিকবার আবেদন করা হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) এম এম রকীব উর রাজা বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালনকালে এমন নিঃস্বার্থ উদ্যোগ তিনি খুব কমই দেখেছেন। পরিচয়হীন লাশ দাফনের দায়িত্ব নিতে অনেকেই এগিয়ে আসেন না, কিন্তু ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’ তা নিয়মিতভাবে করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ উদ্যোগে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

ট্রেন ও সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে যাওয়া কিংবা পচা-অর্ধগলিত মরদেহ—এ ধরনের বেশিরভাগ লাশই বেওয়ারিশ হিসেবে শনাক্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিচয় মিললেও স্বজনরা না এলে সেসব মরদেহও দাফনের দায়িত্ব নেয় সংগঠনটি। এ মানবিক কার্যক্রমের মাধ্যমে জেলায় ‘বেওয়ারিশ লাশের শেষ ঠিকানা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’।

এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর