বরিশাল বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ হাম আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে বরগুনায়। জেলায় ইতোমধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে তিন শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ-আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের পাশাপাশি অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। এ পরিস্থিতিতে বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল ভিজিট করেন বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল।
সরেজমিনে, বরগুনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, হামের উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুদের ভিড়ে মেঝেতেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেককে। হাসপাতালটিতে এখন পর্যন্ত দেড় শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৭৩ জনের নমুনা পরীক্ষায় ২৫ শিশুর শরীরে হাম এবং একজনের শরীরে রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৩৪ জনের মধ্যে ৩২ জনই শিশু।
বিজ্ঞাপন

অভিভাবকদের ভাষ্য, শিশুদের প্রথমে জ্বর, পরে সর্দি-কাশি এবং পরবর্তীতে নিউমোনিয়া, শরীরে র্যাশ ও চোখ ওঠার মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, উচ্চ সংক্রমণশীল এ রোগ ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ দেখা গেছে বরগুনা সদর উপজেলায়। ফলে আতঙ্কিত হয়ে অভিভাবকরা শিশুদের টিকাকেন্দ্রে নিয়ে আসছেন।
সালেহা নামের এক অভিভাবক জানান, আমার ৯ মাস বয়সী শিশুর হঠাৎ জ্বর আসে। পরে সর্দি-কাশি ও চোখ ওঠে। হাসপাতালে নিয়ে এলে হাম সন্দেহে ভর্তি করা হয়।
বিজ্ঞাপন
অন্য অভিভাবক মালেক মান্নান বলেন, প্রথমে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ খাওয়াই। কাজ না করায় হাসপাতালে আনলে হাম সন্দেহে ভর্তি করা হয়। এখন শরীরে র্যাশ উঠেছে।
টিকা দিতে আসা নাসরিন আক্তার বলেন, আমার মেয়েকে আগে দুই ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। তবুও বর্তমান পরিস্থিতিতে বুস্টার ডোজ দিতে এনেছি।

বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ইপিআই) মো. এনামুল কবীর জানান, ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে এ টিকার আওতায় আনা হচ্ছে। অন্য টিকা নেওয়ার ২৮ দিন পর হামের টিকা নিতে হবে এবং হামের টিকা নেওয়ার পর ২৮ দিনের মধ্যে অন্য টিকা দেওয়া যাবে না। অসুস্থ শিশুদের সুস্থ হওয়ার পর টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
শিশু বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মেহেদী পারভেজ বলেন, প্রতিদিনই হাম আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক। এটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ, তাই সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। শিশুদের অপ্রয়োজনে বাইরে না নেওয়া এবং টিকা নিশ্চিত করা জরুরি।
মেডিসিন বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মো. আশিকুর রহমান বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কে সংক্রমণ ও জটিলতা। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বরগুনা সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অরুনাভ চৌধুরী জানান, ইতোমধ্যে সদর উপজেলায় টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। প্রথম দিনেই ১ হাজার ৮৮৪ জন শিশু টিকা গ্রহণ করেছে। উপজেলায় ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ২৩ হাজার শিশুকে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে।
বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রেজওয়ানুর আলম বলেন, হাম আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য জেলায় মোট ৪৭টি আইসোলেশন শয্যা প্রস্তুত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৪০টি বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে। প্রতিদিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা দুই শিফটে রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। এখন পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি।

এদিকে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, হাম সংক্রমণ প্রতিরোধে বিভাগজুড়ে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যাদের শরীরে হামের উপসর্গ দেখা যাবে, তাদের দ্রুত আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে, যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা টিকাদান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করেছেন।
তিনি আরও বলেন, অভিভাবকদের আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকতে হবে। শিশুর জ্বর, সর্দি-কাশি বা র্যাশ দেখা দিলে দেরি না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে এবং নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিনিধি/এসএস

