ঝিনাইদহ সদর উপজেলার গান্না ইউনিয়নে জামায়াত-বিএনপি সংঘর্ষে আহত কৃষকদল নেতার মৃত্যু নিয়ে জামায়তে ইসলামী নির্লজ্জ মিথ্যাচার করছে বলে দাবি করেছে ঝিনাইদহ জেলা বিএনপি। একই সঙ্গে জামায়াতের চিহ্নিত সশস্ত্র ক্যাডারদের হামলায় কৃষকদল নেতা তরু মুন্সি নিহত হয়েছেন বলেও বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
রোববার (১৫ মার্চ) বেলা সাড়ে ১১টায় ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি করের জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতারা।
বিজ্ঞাপন
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মুন্সি কামাল আজাদ পান্নু। এসময় জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এমএ মজিদ, সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনা, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মজিদ বিশ্বাস, এম শাহজাহান, পৌর বিএনপির সভাপতি মাহবুবুর রহমান শেখর, সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন আলমসহ জেলা বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, গান্না ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ড কৃষকদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাধবপুর গ্রামের তরু মুন্সিকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত সবাইকে দ্রুত গ্রেফতার করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। জামায়াতের পক্ষ থেকে তরু মুন্সি মুন্সির মৃত্যু নিয়ে নির্লজ্জ মিথ্যাচার করা হচ্ছে। জেলা বিএনপি জামায়াতের এমন প্রোপাগাণ্ডার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, আর মাত্র ৪ দিন পরে পবিত্র ঈদুল ফিতর। গত ১৩ মার্চ শুক্রবার গান্না ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামের ওহিদুল ইসলামের বাড়িতে একটি রাজনৈতিক দলের মহিলা কর্মীরা ধর্মীয় আলোচনার নামে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম বৃদ্ধির উদ্দেশে তালিমের আয়োজন করে। সেখানে তারা তাদের সংগঠনের নারী কর্মী ছাড়াও গ্রামের সহজ-সরল নারীদেরকে আহ্বান করে। সেখানে নিহত তরু মুন্সির ছেলে ছাত্রদল নেতা শিপনের স্ত্রী মোছা. আঁখি খাতুনও উপস্থিত হয়। আঁখি খাতুন খেয়াল করেন ধর্মীয় আলোচনা শোনার আহ্বান করা হলেও সেখানে রাজনৈতিক আলোচনা ও বিএনপির বিরুদ্ধে হিংসাত্মক প্রচার-প্রপাগান্ডা চালানো হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আঁখি খাতুন প্রতিবাদ করলে, ওই দলের নারী কর্মীদের সঙ্গে তার বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। এক পর্যায়ে বিষয়টি স্থানীয় বিএনপির নেতৃকর্মীদের মাঝে জানাজানি হলে তারা বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ জানালে ওই দলটির নারী ও পুরুষ নেতাকর্মীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এতে তরু মুন্সি ও তরু মুন্সির ছেলে ছাত্রদল নেতা শিপনসহ বিএনপির ৮ জন নেতাকর্মী মারাত্মকভাবে আহত হয়। আহতদের মধ্যে তরু মুন্সি ও শিমুলের শারীরিক অবস্থা গুরুতর বিবেচনায় তাদেরকে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাদেরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন।
পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসাধীন অবস্থায় তরু মুন্সি মারা যান এবং শিমুল ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন আছে।
বিজ্ঞাপন
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, এই হত্যাকাণ্ডকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য বেহেস্তের টিকিট বিক্রি করা ওই দলের নেতৃবৃন্দ আনুমানিক সকাল ১০টার ঘটনাকে 'ইফতার মাহফিলে বিএনপি'র হামলা' এবং তরু মুন্সির হত্যাকাণ্ডকে অতিরিক্ত ডায়াবেটিকস ও হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। অথচ তরু মুন্সির মাথায় ও পায়ে সুস্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন আছে। সুরতহাল ও সিটিস্ক্যান রিপোর্টেও আঘাতের সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।
জামায়াতের নেতাকর্মীরা ধর্মের নামে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও লোভ দেখিয়ে নিজের কর্মী ছাড়াও অন্য রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মীর সহজ-সরল মা বোনদের তাদের দলে ভেড়ানোর কর্মসূচি হাতে নেয়।
সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মুন্সি কামাল আজাদ পান্নু লিখিত বক্তব্যে বলেন, আমাদের দলীয় কর্মী তরু মুন্সির নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরও আমাদের নেতাকর্মীরা অত্যন্ত ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। আপনারা ফ্যাসিস্ট হাসিনার সময়ের কথা একটু চিন্তা করুন। তখন যদি সরকারি দলের কোনো নেতাকর্মী এই রকম নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতো, তাহলে পরবর্তী পরিবেশ কেমন হতো?
আমরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রধান আসামিসহ ৪ জনকে আটক করায় প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। সেই সঙ্গে এই বর্বরোচিত নির্মম ঘটনার সঙ্গে জড়িত সব সন্ত্রাসীকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেফতার করার জন্য দাবি জানাচ্ছি।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এমএ মজিদ বলেন, তরু মুন্সির মৃত্যুর কারণ সুরতহাল প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমরা চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হতে পারব। প্রশাসন ও চিকিৎসকদের বলতে চাই, আমরা আশা করব, আপনারা সঠিক ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন করবেন। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে টেম্পারিং করা হলে জেলা বিএনপি তা বরদাস্ত করবে না।
প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার সদর উপজেলার গান্না ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামের ওহিদুলের বাড়িতে জামায়াতের মহিলা কর্মীরা তালিম করার জন্য জড়ো হয়। মহিলা কর্মীদের জড়ো হওয়া দেখে প্রতিবেশী ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ইলিয়াস হোসেন সেখানে গিয়ে তালিম করার কারণ জানতে চান। এ নিয়ে বাকবিতণ্ডার জেরে জামায়াত ও বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ১২ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে কৃষকদল নেতা তরু মুন্সি ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার রাত ৮টার দিকে মারা যান। সংঘর্ষ ও মৃত্যুর ঘটনায় শনিবার নিহত তরু মুন্সির ছেলে ছাত্রদল নেতা শিপন মুন্সি (২৩) বাদী হয়ে সদর থানায় ৫১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতদের নামে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ওই মামলার ১ নং আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
এদিকে কৃষকদল নেতা তরু মুন্সির মৃত্যুকে 'স্ট্রোক ও উচ্চ ডায়াবেটিস' জনিত কারণে হয়েছে বলে দাবি করে আসছে জামায়াতে ইসলামী। সদর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবি করেন। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিএনপি নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এসব নিয়ে জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে রোববার সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
প্রতিনিধি/এসএস

