পবিত্র রমজান শুরু হওয়ার পর দেশের অন্যতম পর্যটন নগরী কক্সবাজারে পর্যটক উপস্থিতি হঠাৎ করেই কমে গেছে। ফলে হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহনসহ পর্যটননির্ভর বিভিন্ন খাতে বড় ধরনের মন্দা দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, পুরো রমজান মাসজুড়ে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পে কয়েক শত কোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
সরেজমিনে দেখা গেছে, যে সমুদ্রসৈকত কয়েক সপ্তাহ আগেও হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখর ছিল, সেখানে এখন হাতেগোনা কয়েকজন দর্শনার্থী ছাড়া তেমন কাউকে দেখা যায় না। সুগন্ধা, কলাতলী ও লাবণী পয়েন্টজুড়ে বিরাজ করছে নীরবতা। পর্যটক না থাকায় অনেক হোটেল-মোটেল, গেস্টহাউস, রেস্তোরাঁ এবং ঝিনুক ও হস্তশিল্পের দোকান বন্ধ হয়ে গেছে।

পর্যটন সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কক্সবাজার শহরে পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে। রমজানের আগে প্রতিদিন এসব আবাসিক হোটেলে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার পর্যটক অবস্থান করতেন। কিন্তু রমজান শুরু হওয়ার পর তা নেমে এসেছে কয়েক শতাধিকের মধ্যে। ফলে বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ কক্ষই ফাঁকা পড়ে আছে।
পর্যটক আকর্ষণে অনেক অভিজাত হোটেল ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় ঘোষণা করলেও তাতে উল্লেখযোগ্য সাড়া মিলছে না। সি গাল, ওশান প্যারাডাইস ও সায়মন বিচ রিসোর্টের মতো বড় হোটেলগুলোতেও বুকিং প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে।
বিজ্ঞাপন

ব্যবসায়ীরা জানান, পর্যটক না থাকায় কক্সবাজারে পর্যটননির্ভর অন্তত তিন হাজারের বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। সৈকতজুড়ে থাকা কয়েকশ ভ্রাম্যমাণ আলোকচিত্রী, ৩৫টি ঘোড়া, অর্ধশতাধিক বিচ-বাইক এবং দেড় শতাধিক শামুক-ঝিনুকের দোকানেও এখন ক্রেতা নেই।
সৈকত এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ঝিনুক মার্কেট, আচারের দোকান ও রঙিন কাপড়ের দোকানগুলোর অধিকাংশই বন্ধ। অনেক দোকানের সামনে ধুলোর আস্তর জমেছে। জনশূন্য বালুচরে ঘোড়াগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর ঘোড়াওয়ালারা অলস সময় পার করছেন।
সৈকতে সারি করে দাঁড়িয়ে আছে বিচ-বাইকগুলো। চালকেরা অপেক্ষা করছেন, যদি কোনো পর্যটক এসে ওঠেন। ফটোগ্রাফাররাও হাতে ক্যামেরা নিয়ে ঘুরছেন, কিন্তু ছবি তোলার মতো পর্যটক নেই।

পর্যটক কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানে। পর্যটকশূন্যতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করেছে। এতে ঈদের আগে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন বহু শ্রমজীবী মানুষ।
কলাতলী এলাকার এক হোটেল ব্যবসায়ী তৌহিদুর ইসলাম বলেন, রমজান শুরু হওয়ার পর মাত্র দুইদিন কয়েকটি কক্ষ ভাড়া দিতে পেরেছি। এখন পুরো হোটেল প্রায় ফাঁকা।
লাইফগার্ড সংস্থার কর্মী মোহাম্মদ আলী বলেন, রমজানের আগে প্রতিদিন সৈকতে বিপুল পর্যটক থাকত। এখন একেবারেই শূন্য । দায়িত্ব পালন করছি, কিন্তু সময়টা খুবই অলস কাটছে।

ঘোড়াওয়ালা কাসেম আলী বলেন, রমজান আসার পর সৈকতে পর্যটক নেই। এখন ঘোড়ার খাবারের টাকাও উঠছে না।
বিচ-বাইক চালক জাহেদ হাসান জানান, লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী এলাকায় অনেক সময় মিলিয়ে ১০০ জনের বেশি পর্যটকও দেখা যায় না। যার কারণে কোনো ভাড়া নেই।
সৈকতের ফটোগ্রাফার তমিজ উদ্দিন বলেন, রমজানের আগে লাবণী পয়েন্টে প্রতিদিন শতাধিক ফটোগ্রাফার থাকত। এখন মাত্র ১০ থেকে ২০ জন। অনেক দিন ১০০ টাকাও আয় হয় না।

পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, রমজানের এই মন্দা সাময়িক। ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে আবারও পর্যটকের ঢল নামবে এবং তখন রমজানের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
হোটেল-মোটেল ও গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, এবার পর্যটকশূন্যতা আগের বছরের তুলনায় বেশি। প্রায় সব ধরনের হোটেলেই বুকিং শূন্যের কাছাকাছি। তবে ঈদের দিন থেকে আবার পর্যটক আসা শুরু হবে বলে আশা করছি।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের পুলিশ সুপার উত্তম প্রসাদ পাঠক বলেন, সৈকতে যারা শান্ত পরিবেশ উপভোগ করতে আসছেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। পর্যটক কম হলেও নিরাপত্তায় কোনো শিথিলতা নেই।
প্রতিনিধি/টিবি

