পরিবেশ আইন উপেক্ষা করে চট্টগ্রামের জামালখান এলাকায় জয়পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণ করছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। পাহাড় কাটার সত্যতা পেয়ে বিপিসিকে ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। একই সাথে পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণকাজ বন্ধের আদেশসহ কাটা স্থান পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এরআগে এই অভিযোগে ওএসডি করা হয়েছে বিপিসির চেয়ারম্যান আমিন উল আহসানকে।
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত শুনানি শেষে এই আদেশ দেন মহানগর কার্যালয়ের পরিচালক সোনিয়া সুলতানা। পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মুক্তাদির হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ‘সরেজমিন পরিদর্শন রিপোর্ট অনুযায়ী তফসিলভুক্ত ওই স্থানে পাহাড় কাটার সত্যতা পাওয়া গেছে। পরিদর্শনে দেখা যায়, দৈর্ঘ্যে প্রায় ১৫০ ফুট, প্রস্থে ৮ ফুট এবং উচ্চতায় ৮ ফুট মোট আনুমানিক ৯ হাজার ৬০০ ঘনফুট দৃশ্যমান পাহাড় কাটা হয়েছে।’
সে তথ্যের ভিত্তিতে ‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) এর ৬ (খ) ধারার অপরাধে এবং ৭ ধারার আওতায় পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার ক্ষতিসাধনের জন্য পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন করা হয়েছে। প্রতি ঘনফুট ১০০ টাকা হারে ৯ হাজার ৬০০ ঘনফুট পাহাড় কাটার জন্য মোট ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছে।’
একই সাথে কাটা স্থান পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়া দৃশ্যমান পাহাড় বা টিলা না কাটার জন্য সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করা হয়েছে। শুনানিতে বিপিসির পক্ষে ডিজিএম এস এম জোবায়ের হোসেন এবং এলডিএ মো. শিহাব উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।
বিজ্ঞাপন

প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের পরিদর্শক মুহাম্মদ আশফাকুর রহমান ও সিনিয়র টেকনিশিয়ান মো. ওমর ফারুক। এসময় সরেজমিন পরিদর্শন প্রতিবেদন, বিবাদীপক্ষের লিখিত বক্তব্য এবং দালিলিক প্রমাণাদি পর্যালোচনা করা হয়।
সূত্র জানায়, এরআগে গত ২৮ জানুয়ারি নগরীর জামালখান এলাকায় জয়পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি টিম। সেখানে গিয়ে দেখা যায় পাহাড় কেটে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ করা হচ্ছিল, যা পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
এসময় তাৎক্ষণিকভাবে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওইদিন ২৮ জানুয়ারি বিপিসি কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বিপিসির বিরুদ্ধে একতরফাভাবে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
এরপর ২৯ জানুয়ারি পাহাড় কাটার ঘটনায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান (সচিব) মো. আমিন উল আহসানকে বদলিপূর্বক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে পদায়ন করা হয়।
আরও পড়ুন:
পাহাড়ের বুকে দৃষ্টিনন্দন সড়ক
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন নিয়োগ-১ শাখা থেকে ওইদিন এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপনটি স্বাক্ষর করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব জেতী প্রু। মো. আমিন উল আহসান বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তা। তিনি বিপিসি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের আগে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে ওই সময় বিপিসির চেয়ারম্যানের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও কোন সাড়া মেলেনি।
বিপিসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘জয়পাহাড় এলাকায় তাদের নিজস্ব জমিতে পাঁচতলা স্টিল স্ট্রাকচারের একটি ভবন নির্মাণ করা হচ্ছিল। দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব কার্যালয় না থাকায় ভাড়া ভবনে অফিস পরিচালনা করতে হচ্ছে বলেই নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেখানে অবকাঠামো স্থাপনে খনন কাজ করা হচ্ছে। কোন পাহাড় কাটা হচ্ছে না।’
এ ঘটনায় বিপিসি চেয়ারম্যান আমিন উল আহসানকে ওএসডি করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটা আমার পক্ষে বলা সম্ভব না। আমি ভাই আদার বেপারি, জাহাজের খবর নিয়ে লাভ নেই।’
এদিকে পাহাড় কাটার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। তাদের মতে, চট্টগ্রাম মহানগরে এভাবে একের পর এক পাহাড় ধ্বংস করা হলে ভূমিধসের ঝুঁকি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। একইসঙ্গে নগরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জননিরাপত্তা মারাত্নক হুমকির মুখে পড়বে।
এএম

