ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোরেশোরে প্রচারণা চালাচ্ছেন বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা। প্রার্থী, কর্মী-সমর্থক দলে দলে ভাগ হয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন আর বিভিন্ন কৌশলে ভোটারদের মন জোগাতে চেষ্টা করছেন। রাজপথে চলছে মাইকিং, মিছিল, পথসভা। স্থানে স্থানে সাটানো হয়েছে বিলবোর্ড, ব্যানার। চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে সর্বত্র চলছে ভোটের আলোচনা। কে হচ্ছেন পরবর্তী সংসদ সদস্য তা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে চলছে নানা সমীকরণ। তবে এবার নির্বাচনে মাদক, সন্ত্রাস ও ছিনতাই নিয়ে ভোটারদের রয়েছে আলাদা চিন্তা ভাবনা।
ভোটাররা বলছেন, বিগত দিনগুলোতে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মাদক বেচাকেনাসহ নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত হতো। অনেক সময় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা থাকলেও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এসব অপরাধীদের বেপরোয়া করে তুলে ছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এখানকার মানুষের স্বপ্ন মাদক ও ছিনতাই মুক্ত একটি স্বাভাবিক সমাজ।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, টঙ্গীর তুরাগ নদের পাড় ধরে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের শেষ সীমানা। তুরাগের অন্য পাশে রাজধানী ঢাকা। রাজধানী সংলগ্ন হওয়ায় টঙ্গী এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোট-বড় ১৯টি বস্তি। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, এসব বস্তি এখন মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে ভাসমান লোকজন বসবাস করায় সহজেই নানা অপরাধ সংঘটিত হয়।
এবার নির্বাচনে প্রার্থীরা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান আর আধুনিক নগরের স্বপ্ন দেখালেও ভোটারদের আলোচনার কেন্দ্রে ঘুরেফিরে আসছে দুটি বিষয় মাদক ও ছিনতাই। ভোটারদের মতে, এবার নির্বাচনে এমপি প্রার্থীদের কাছ থেকে তারা শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, স্পষ্ট অবস্থান চান। মাদক আর ছিনতাই বন্ধ করতে না পারলে উন্নয়ন অর্থহীন। তাই যিনি এসব বন্ধ করবেন ও প্রতিশ্রুতি দেবেন, তাকেই ভোট দেবেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এসব বস্তি থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার মাদক বিক্রি হয়। মাদক কারবারে অবাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোর থেকে শুরু করে নানা বয়সি মানুষ।
বিজ্ঞাপন
এলাকাবাসীর দাবি, মাদক ও ছিনতাইয়ের কারণে টঙ্গীজুড়ে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। টঙ্গী বাজার, স্টেশন রোড, চেরাগ আলী, এরশাদ নগর সহ বিভিন্ন এলাকায় হরহামেশা ঘটছে ছিনতাই। ছিনতাই রোধে পুলিশের পক্ষ থেকে বিআরটি প্রকল্পের তিনটি স্টেশনের নীচে নামার সিঁড়ি বন্ধ করে দেওয়ার পরও থামছে না অপরাধ।
টঙ্গী বাজার এলাকায় ব্যবসা করেন হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, আমাদের এখানকার সবচেয়ে বড় সমস্যা মাদক ও ছিনতাইকারীদের অত্যাচার। এসব অপরাধীদের বেপরোয়া তৎপরতায় ভালো মানুষ অনেকটা কোণঠাসা। এ দুটি বন্ধ করতে পারলে আমরা শান্তিতে বসবাস ও ব্যবসা করতে পারব।
মধুমিতা এলাকার বাসিন্দা গোলাপী বেগম বলেন, মাদক ও ছিনতাই এলাকার নিত্য দিনের সমস্যা। আমরা এমন একজন জনপ্রতিনিধি চাই যিনি এসব অপরাধ নির্মূলে কাজ করবেন।
চান্দনা চৌরাস্তা এলাকার ভোটার নাঈমুল হাসান বলেন, ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্যে রাতে স্বাভাবিক চলাফেরা করা যায় না। সম্প্রতি আউট পাড়া এলাকায় দিনে দুপুরে গুলি ও ককটেল ফাটিয়ে টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এসব নিয়ে আমরা আতঙ্কিত। আমরা চাই, সামনের নির্বাচনে যিনি বিজয়ী হবেন তিনি যেন এসব সমস্যা সমাধানে নজর দেন।
এরশাদ নগর এলাকার ভোটার মেহেদী হাসান বলেন, শুধু মাদক নয়, ছিনতাই এখন এ এলাকার আরেকটি বড় আতঙ্ক। টঙ্গী এলাকার বস্তিগুলো ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে। পোশাক শ্রমিক রত্না বেগম বলেন, কারখানা ছুটি হলে রাতে বাসায় ফিরতে ভয় লাগে। মোবাইল, টাকা তো যায়ই। কখন যে প্রাণ যাবে, তারও নিশ্চয়তা নেই। যে প্রার্থী ছিনতাই বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেবে, তাকেই ভোট দেব।
এদিকে, মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি মুক্ত এলাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ভোট চাইছেন বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা। বলছেন, এসব সমস্যা সমাধানে নানা রূপরেখা। প্রচার প্রচারণায় থাকছে এসব সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি।
এবার গাজীপুর-২ (গাজীপুর ও টঙ্গী) আসনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী এম মঞ্জুরুল করিম রনি। তিনি গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও গাজীপুর সিটির প্রথম মেয়র, সাবেক প্রতিমন্ত্রী প্রয়াত অধ্যাপক এম এ মান্নানের ছেলে।
এখানে ১১-দলীয় জোটের এনসিপির প্রার্থী আলী নাছের খান। এ দুজন ছাড়াও এই আসন থেকে আরও ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। গাজীপুর -১ আসনে বিএনপির প্রার্থী মজিবুর রহমান। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী শাহ আলম বকশী। এছাড়া এই আসনে আরও ৬ জন বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা মাঠে রয়েছেন। গাজীপুর -৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু। তার প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী ইজাদুর রহমান মিলন, খেলাফত মজলিসের এহসানুল হক। এই আসনে মোট ৭ জন প্রার্থী রয়েছেন। গাজীপুর - আসনে বিএনপির প্রার্থী শাহ রিয়াজুল হান্নান। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী সালাহউদ্দিন আইয়ুবী। এছাড়া এই আসনে আরও ৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া গাজীপুর -৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী একেএম ফজলুল হক মিলন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী খায়রুল হাসান। এই আসনে মোট ৭ জন নির্বাচনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।
এ ব্যাপারে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান বলেন, মাদক ও ছিনতাই দমনে ক্রস পেট্রোলিং ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাত ১২টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত আব্দুল্লাহপুর থেকে সাতাশ পর্যন্ত একটি টিম এবং চান্দনা চৌরাস্তা থেকে রাজেন্দ্রপুর অপর একটি টিম কাজ করছে। এছাড়া নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০টি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। আমাদের ৩ হাজার ৩০০ জনবল রয়েছে। তাদের এসব কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে। এসব তৎপরতার কারণে মানুষের ভেতর স্বস্তি এসেছে।
প্রতিনিধি/এসএস

